ফের ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ ঘিরে হুমকি ট্রাম্পের, কতটা সম্ভব এই অভিযান?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ১২: ৩৭
ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা ও এর পাশের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের স্যাটেলাইট চিত্র। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ এলাকায় শিগগিরই হামলা চালানোর বিষয়ে ফের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শিগগিরই’ ওই এলাকায় আঘাত হানবে। একই সঙ্গে দাবি করেছেন, তেহরান এখন ‘মরিয়া হয়ে’ আলোচনায় বসতে চাইলেও অর্থবহ আলোচনার জন্য প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ নেই।

তবে ট্রাম্পের এই হুমকির পরই প্রশ্ন উঠেছে— পাহাড়ের অন্তত ১০০ মিটার গভীরে নির্মাণাধীন এই স্থাপনায় আদৌ সফল হামলা চালানো সম্ভব কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘বাংকার বাস্টার’ বোমাও হয়তো এই স্থাপনায় পৌঁছাতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে স্থল অভিযান, নাশকতা কিংবা বিশেষ ধরনের গভীর অনুপ্রবেশকারী অস্ত্র ব্যবহারই হতে পারে সম্ভাব্য বিকল্প।

ফের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা

মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘খুব শিগগিরই আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় হামলা চালাব।’ এর আগে গত সপ্তাহেও একই ধরনের হুমকি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে গুঁড়িয়ে দেবে।

একই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইরান এখন ‘মরিয়া হয়ে’ বৈঠক করতে চায়। তার ভাষায়, ‘তারা খুব মরিয়া হয়ে বৈঠক করতে চায়। কিন্তু তারা অর্থবহ আলোচনার জন্য প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।’

কী এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন?

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এটি ইরানের অন্যতম প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে।

নাতাঞ্জে ইরানের দুটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে। বহু বছর ধরেই এটি দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।

পাহাড়টির নিচে দুটি গভীর টানেল কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির (আইএসআইএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব টানেল অন্তত ১০০ মিটার গভীরে নির্মিত এবং এর প্রবেশপথগুলো ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সেখানে দুটি জোড়া টানেল প্রবেশপথ রয়েছে, যেগুলো সম্ভবত একই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় পৌঁছেছে। পুরো এলাকা জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে এবং প্রবেশপথগুলোকে বোমা হামলা প্রতিরোধে বিশেষভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই পাহাড়?

২০২০ সালে নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় নাশকতার ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পরই এই নতুন ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে ইরান।

সে সময় ইরানের তৎকালীন পারমাণবিক প্রধান আলি আকবর সালেহি ঘোষণা দেন, নাতাঞ্জের পাশের পাহাড়ে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ তৈরির জন্য আরও আধুনিক, বড় এবং পূর্ণাঙ্গ একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি চলতি বছরের মার্চে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। গ্রোসির ভাষায়, এটি ছিল ইরানের সবচেয়ে সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে ক্রমান্বয়ে ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।

আগের হামলাগুলোতেও অক্ষত ছিল স্থাপনাটি

চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধেও নাতাঞ্জে হামলা হয়েছিল। কিন্তু পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নিচে নির্মাণাধীন টানেল কমপ্লেক্সে কোনো হামলা হয়নি।

আইএসআইএসের মতে, স্থাপনাটি এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। তবে নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, স্যাটেলাইট চিত্র দেখে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় কবে এটি পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করবে।

সেখানে কী করছে ইরান?

বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন এবং পারমাণবিক কর্মসূচির অত্যন্ত সংবেদনশীল কার্যক্রম পরিচালনার জন্যই এই স্থাপনাটি তৈরি করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগের পরিকল্পনা পরিবর্তন হতে পারে।

আইএসআইএসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে যদি ইরান আবার সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ছোট আকারের হলেও এমন একটি সংযোজন কেন্দ্র স্থাপন করা হতে পারে, যা পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকেও সহায়তা করতে সক্ষম হবে।

অবশ্য ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।

হামলা চালানো কতটা সম্ভব?

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর অবস্থান। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপনাটি এত গভীরে নির্মিত যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার বাস্টার বোমাও হয়তো সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে না।

এ কারণে আইএসআইএস মনে করছে, এই স্থাপনায় সফল আঘাত হানতে হলে স্থল অভিযান বা নাশকতা তুলনামূলক বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম বিশেষ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে আকাশপথ থেকেও কিছু দুর্বল স্থানে আঘাত হানার সুযোগ থাকতে পারে।

ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক স্যাম লেয়ার রয়টার্সকে বলেন, সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ইরান টানেলের প্রবেশপথ আরও শক্তিশালী করছে। এতে বাঙ্কার বাস্টারসহ গভীর অনুপ্রবেশকারী অস্ত্র দিয়েও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

লেয়ারের মতে, এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, ইরান এখনো সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চায় এবং সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা আরও জোরদার করছে।

যুদ্ধের নতুন লক্ষ্যবস্তু?

গত ১৩ জুলাই ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ওপর নিবিড় নজর রাখছে। তখন তিনি দাবি করেন, ‘আমরা সেখানে কোনো কার্যক্রম দেখতে পাচ্ছি না। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা ভালো নয়। যখনই আমরা কিছু শুনি, তখনই সেটি উড়িয়ে দিই। তাই তারা এ নিয়ে কথা বলতে চায় না। তবে খুব শিগগিরই পিকঅ্যাক্সেও আঘাত হানতে পারি।’

বিশ্লেষকদের মতে, নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহানের পর যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা চালায়, তাহলে সেটি হবে ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের একটি। এর সফলতা নির্ভর করবে শুধু হামলার শক্তির ওপর নয়, বরং পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এই স্থাপনার প্রকৃত কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের অস্ত্র বা কৌশল ব্যবহার করে তার ওপরও।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, এএফপি, বিবিসি

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরান যুদ্ধে বিলিয়ন ডলার খরচ, আরও অর্থ চাইছে পেন্টাগন

হোয়াইট হাউস এপ্রিল মাসে আগামী অর্থবছরের জন্য পেন্টাগনের জন্য কংগ্রেসের কাছে এক দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার চেয়েছে, এই অর্থ অনুমোদিত হলে আধুনিক যুগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

২ ঘণ্টা আগে

বিক্ষোভের মুখে ইউক্রেনের সেনাপ্রধান বরখাস্ত, নতুন প্রধান দ্রাপাতি

৩৫ বছর বয়সী মিখাইলো ফেদোরভ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন গতি আনা, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের জন্য ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। অন্যদিকে ৬০ বছর বয়সী সিরস্কিকে ইউক্রেনের অনেকেই ‘সোভিয়েত ধাঁচের’ সামরিক কমান্ডার হিসেবে দেখতেন, যিনি সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের সংস্কার আনতে অনাগ

৫ ঘণ্টা আগে

ইরান যুদ্ধে এবার নতুন ফ্রন্টে হুতিরা, ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি ট্রাম্পের

এ পরিস্থিতিকে নতুন যুদ্ধফ্রন্ট হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, তারা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয় বা হুমকি বাস্তবায়ন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাদের দেখে নেবে’।

১৩ ঘণ্টা আগে

ইরানি ড্রোন ধ্বংস করতে নিহত মার্কিন সেনার পরিচয় প্রকাশ

পেন্টাগন জানিয়েছে, নিহত ওই মার্কিন সেনা হলেন সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টন। তার বয়স হয়েছিল ৩০ বছর। উত্তর ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটিতে শনিবার দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নিহত হন। সুইন্টন ইরাকে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানে নিয়োজিত ছিলেন।

১৫ ঘণ্টা আগে