হামলা-পালটা হামলায় ফের হুমকির মুখে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রক্রিয়া

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত এখনো চলছেই। প্রতীকী ছবি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ থামাতে অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার আগেই তা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গত কয়েক দিনে উভয় পক্ষের হামলা-পালটা হামলা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সামরিক হুমকি পরিস্থিতিকে আবারও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রোববার দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি স্থাপনায় নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরপরই বাহরাইন ও কুয়েত লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে চলমান আলোচনাও পুরোপুরি স্থগিত করার হুমকি দেয় দেশটি। জবাবে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এমন সময় আসতে পারে যখন তিনি আর আলোচনায় আগ্রহী থাকবেন না এবং যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে 'কাজ শেষ' করবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, 'যদি এমনটা হয়, তাহলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর অস্তিত্ব থাকবে না।'

কুয়েত জানিয়েছে, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের হামলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ নিহত হয়নি।

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সামরিক অভিযানের সময় ছিটকে আসা ধাতব টুকরার আঘাতে একজন কাতারি নাগরিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। তারা একটি নৌকায় ছিলেন, যা আগের দিন নিখোঁজ হয়েছিল। তবে ঘটনাটি সরাসরি ইরানের ড্রোন হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানায়নি দোহা।

এই নতুন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ পথ কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এখন যুক্তরাষ্ট্র চায়, আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালি সব দেশের জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকুক এবং ওমান উপকূল ঘেঁষে একটি দক্ষিণাঞ্চলীয় করিডোর দিয়ে জাহাজ চলাচল করুক। বিপরীতে ইরান চায়, জাহাজগুলো তাদের জলসীমা দিয়ে উত্তরাঞ্চলীয় রুট ব্যবহার করুক, যেখানে চলাচল পুরোপুরি তেহরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ভবিষ্যতে এই পথ ব্যবহারের জন্য ফি আদায়ের পরিকল্পনাও করেছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসনের জবাব হিসেবেই তারা দক্ষিণ ইরানের সামরিক নজরদারি ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং সমুদ্রে মাইন পেতে ব্যবহৃত স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

এর আগে শনিবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগও আনে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাংকার কিকুতে হামলা চালিয়েছে ইরান। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানির অপরিশোধিত তেল বহনকারী জাহাজটি ওমান উপকূল ঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় করিডোর ব্যবহার করছিল। এরও কয়েক দিন আগে একই রুটে চলাচলের সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজেও ড্রোন হামলার অভিযোগ ওঠে।

অন্যদিকে ইরান নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইরাক সফরে গিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ইরানের হাতে থাকবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বাইরে অন্য কোনো ব্যবস্থা বা বিকল্প কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেবল উত্তেজনা বাড়াবে এবং প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করবে।

আরাগচি আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা উচিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা বাইরের কোনো শক্তির উপস্থিতি থাকবে না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতাকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবেই নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করছে ইরান।

চলতি মাসের শুরুতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। ওই বৈঠকের পর দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে, যার আওতায় ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির খসড়া তৈরির কথা রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ— এই তিনটি ইস্যুতে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

রোববারের হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এক বিবৃতিতে বাহিনীটি বলেছে, 'যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের যেকোনো পদক্ষেপ চলমান সব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেবে।' একই সঙ্গে আইআরজিসির নৌ বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো আগামী দিনগুলোতে 'নরকের অভিজ্ঞতার' মুখোমুখি হবে।

বাহরাইন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং দেশটির সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসী নীতিরই অংশ। উল্লেখ্য, বাহরাইনেই মার্কিন নৌ বাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি অবস্থিত, যা যুদ্ধ চলাকালেও একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছিল।

এরই মধ্যে লেবানন সীমান্তেও নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, দক্ষিণ লেবাননের দেইর সেরিয়ানে একটি সন্দেহভাজন স্থাপনায় অভিযানের সময় হিজবুল্লাহর এক সদস্যের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেইর সেরিয়ান ও তাইয়েবাহ শহরের উপকণ্ঠে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

মাত্র দুই দিন আগে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে শত্রুতা বন্ধে নতুন একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবানন থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামোও অপসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু নতুন সংঘর্ষ সেই চুক্তিকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের পরিস্থিতিরও সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর। কারণ তেহরান আগেই স্পষ্ট করেছে, লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে। অন্যদিকে ইসরায়েল, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার অংশ নয়, দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন একাধিক ফ্রন্টে একযোগে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইউরোপ জুড়ে দাবানলের তাণ্ডব অব্যাহত, গ্রিসে ৩ দমকলকর্মী নিহত

বিশেষজ্ঞদের মতে, আটলান্টিক উপকূল থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর, স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস থেকে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত দাবানলের এই ধারা সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে নজিরবিহীন। অনেক আগুনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং শহর ও জনবসতির কাছাকাছি পৌঁছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

১৬ ঘণ্টা আগে

কয়লা কেলেঙ্কারি মামলায় প্রয়াত মনমোহন সিংকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

সুপ্রিম কোর্ট বলেন, সিবিআইয়ের দাখিল করা দুটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আদালতের মনে হয়েছে, সেগুলো বাতিল করে নতুন করে বিচার শুরুর মতো কোনো গ্রহণযোগ্য বা জোরালো কারণ নেই। ফলে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই মামলাটি নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

১৬ ঘণ্টা আগে

আন্দোলন দমনে গুলি চালাতে বলেছিলেন অমিত শাহ— রাহুলের অভিযোগে লোকসভায় হট্টগোল

রাহুল বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে এসে বসার সাহস নেই। আমি তাকে ৩০টি গাড়ির কনভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বসে থাকতে দেখেছি। তিনি আজ সংসদে নেই কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

১ দিন আগে

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে নতুন আইন, সর্বোচ্চ সাজা বেড়ে ১০ বছর

রাজ্যসভায় পাস ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর বিলটি আইনে পরিণত হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষায় অনিয়মে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি বেড়ে হবে ১০ বছরের কারাদণ্ড, পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ রুপি জরিমানার বিধানও থাকবে।

১ দিন আগে