৬ মাস শেষে ‘অচলাবস্থা’য় ইরান যুদ্ধ, সামনে সমঝোতা নাকি দীর্ঘ সংঘাত?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান যুদ্ধ। প্রতীকী ছবি

ছয় মাস আগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা দিয়ে শুরু হয়েছিল এক যুদ্ধ। শুরুতে ধারণা ছিল ‘অসম’ এই যুদ্ধে জয়-পরাজয় চূড়ান্তই, ঘোষণা তা নিশ্চিত হওয়া সময়ের ব্যাপারমাত্র। কিন্তু দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ছয় মাস। আক্রমণ-পালটা আক্রমণ, অবরোধ, হুঁশিয়ারি— সবকিছু পেরিয়ে এ যুদ্ধ এখন দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার মুখে।

এর মধ্যে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তেহরানের সামরিক সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা কিংবা তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব শেষ করার মতো যেসব লক্ষ্য নিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা, তার কোনোটিই এখন পর্যন্ত পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

বরং যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই এর কেন্দ্র সামরিক ময়দান থেকে সরে এসেছে অর্থনীতি, জ্বালানি আর হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের দিকে। ওয়াশিংটন এখন নতুন করে হামলার চেয়ে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর তেহরান সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হরমুজকে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে।

ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের ‘নিশ্চিত পরাজয়’ আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ‘আধিপত্যের জয়ধ্বনি’ নিয়ে যে যুদ্ধের শুরু, ছয় মাস পর এখন ‘ইরানের জয়ধ্বনি’ আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘নৈতিক পরাজয়ে’র দৃশ্যটিই বাস্তবসম্মত। তবে ছয় মাস পেরিয়ে এসে এখন আর ‘কে জিতল’ এই যুদ্ধের মূল জিজ্ঞাসা নয়, বরং প্রশ্ন হলো— কে কত দিন এখনকার অচলাবস্থা সহ্য করতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষকে সমঝোতার দিকে যেতে বাধ্য হতে হবে?

চার-পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধ ছয় মাসে

যুদ্ধ শুরুর আগে কয়েক দফা পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। ওমানের মধ্যস্থতায় ফেব্রুয়ারিতেও আলোচনা এগোচ্ছিল। ২৭ ফেব্রুয়ারি ওমান জানিয়েছিল, ইরান তার পারমাণবিক উপাদানের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সম্মত হওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারিই ইরাসের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনার ওপর হামলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল— ইরানের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা ঠেকানো এবং দেশটির অস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু বক্তব্যে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও স্পষ্ট ছিল।

ট্রাম্প তখন যুদ্ধকে দীর্ঘ করার কথা ভাবেননি। তার হিসাব ছিল, অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ছয় মাস পর সেই হিসাব পুরোপুরি ভেস্তে গেছে।

ইরানও দ্রুত পালটা হামলা চালিয়ে যুদ্ধকে আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত করে। ইসরায়েলের পাশাপাশি কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের মতো যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সবগুলোকেই ইরানি হামলার মুখোমুখি হতে হয়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণা দেয় তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র পালটা ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে অবরোধ তৈরি করে।

এরপর যুদ্ধের সামরিক পর্যায় একাধিকবার তীব্র হয়েছে, আবার কূটনীতির চেষ্টাও হয়েছে। এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দেশটিরই রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মুখোমুখি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সেই পাকিস্তানেরই মধ্যস্থতায় জুনে সমঝোতা স্মারকে সই করে দুই দেশ। লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া। কিন্তু সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত টেকেনি। গত ১৭ আগস্ট সমঝোতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও স্থায়ী সমঝোতার কোনো কাঠামো তৈরি হয়নি।

ইরানকে কতটা দুর্বল করতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র?

সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাফল্য পেয়েছে— এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যুদ্ধে ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের হিসাব বলছে, ইরানের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ইরান অবশ্য ক্ষয়ক্ষতির এসব দাবির সঙ্গে একমত নয়। তেহরান বলছে, তাদের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রভিত্তিক প্রতিরোধ সক্ষমতা অটুট রয়েছে। নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তারা চালু করেছে। হরমুজের ওপর ইরান কখনোই নিয়ন্ত্রণ হারায়নি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও নিঃশেষ হয়ে গেছে— এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় ইরানের হাতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রকৃত অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন, হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে গেলেও তা পুরোপুরি শেষ হয়নি; বরং পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য সময়সীমা প্রায় এক বছর পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আবার সামরিক দিকই একটি যুদ্ধের শেষ কথা নয়। কোনো দেশের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা আর একটি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করা এক বিষয় নয়। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। এই যুদ্ধের ছয় মাস পর এসে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে ইরানকে আঘাত করতে সক্ষম হলেও, এবং এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে হত্যা করলেও রাজনৈতিক যে সমাধান চেয়েছিল, তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।

যুদ্ধের নতুন ময়দান— ইরানের অর্থনীতি

ইরান যুদ্ধের বদলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় জায়গা এটি। সামরিক হামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক মাস ধরে ইরানের অর্থনীতিকে চেপে ধরার চেষ্টা করছে। আগস্টে ওয়াশিংটন প্রায় ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেয়। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে ইরানের তেল, অস্ত্র ও সাইবার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং এমন একটি ‘শ্যাডো ফ্লিট’, যার মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রি করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ।

লক্ষ্য করা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও। শুধু ইরান নয়, এখন ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানও ওয়াশিংটনের নিশানায়।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করেছেন, ইরানের সঙ্গে চিহ্নিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ না করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ আরোপ করা হতে পারে। ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও জাহাজ চলাচল— এই পাঁচটি খাত বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। চীনা ব্যাংকগুলোকে এখনো সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় না আনলেও ওয়াশিংটন সেই সম্ভাবনা খোলা রেখেছে।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল অনেকটা এমন— ইরানের ওপর সরাসরি বোমা কম, কিন্তু তার অর্থনীতির চারপাশে জাল আরও শক্ত করা। আর সেই জাল কেবল ইরান নয়, এর মিত্র বা সহযোগী সব দেশের ওপরও ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু এই অর্থনৈতিক যুদ্ধেও ইরানকে পরাজিত করা সহজ নয়। ইরান বহু বছর ধরেই নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকে নিজেদের অর্থনীতি চালিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে বিকল্প বাণিজ্যপথ, মধ্যস্বত্বভোগী, ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও তেল পরিবহনের গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র এসব নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টা করলেও ইরান এখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।

আগস্টের নতুন মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ— ওয়াশিংটন এবার শুধু ইরানের প্রতিষ্ঠান নয়, ইরানকে টিকিয়ে রাখা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককেও আঘাত করতে চাইছে। কিন্তু এর মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকেও দিতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধটি কতটা ব্যয়বহুল?

জুলাই পর্যন্ত সময়ের হিসাব দিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের ব্যয় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর বাইরে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে আরও ৬৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বরাদ্দ চেয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার ব্যবহৃত গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করার জন্য।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ জানিয়েছিল, জুন পর্যন্ত চার মাসে এ যুদ্ধে মার্কিনিদের সামগ্রিক ব্যয় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। এরপর যুদ্ধ আরও দুই মাস চলেছে। ফলে প্রকৃত ব্যয় এখন আরও বেশি, যা ৬০ বিলিয়ন ডলার পেরিয়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।

কেবল ডলারের হিসাব নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারেও চাপ পড়েছে। যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহারের হিসাব দিয়েছিল পেন্টাগন। পরে জানা যায়, ইসরায়েলকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত ২০০টির বেশি থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবহার করতে হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট মজুতের প্রায় অর্ধেক। প্রতিটি থাডের দাম প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার।

এর প্রভাব এখন ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ইউরোপে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক মজুতকে ‘অত্যন্ত সংকটজনক’ পর্যায়ে নেমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা খরচ করছে না, ইউরোপ ও এশিয়ায় সম্ভাব্য অন্য সংঘাতের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির ওপর চাপ তৈরি করছে।

যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে

ইরান যুদ্ধে কেবল রাষ্ট্রীয় সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সমর্থন করছেন। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই হারই সর্বনিম্ন।

অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধের প্রতি মার্কিনিদের সমর্থন ক্রমান্বয়ে কমছে। গত মার্চেও এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ। এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন ৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৬৯ শতাংশে নে গেছে। একই জরিপে ট্রাম্প অনুমোদন পেয়েছেন মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিনির। তার এই রেটিংও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন।

আরেক জরিপে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, এই যুদ্ধ করাই উচিত ছিল না। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় বিষয়টি ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

অর্থাৎ ট্রাম্পের সামনে এখন একটি অস্বস্তিকর সমীকরণ— ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে ব্যয় ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে, আবার দ্রুত সরে এলে ছয় মাসের যুদ্ধের ফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

হরমুজ— ইরানের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার

ছয় মাস ধরে চলমান এই যুদ্ধে শুরু থেকেই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরান কার্যত বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ করে দেয়। এরপর দফায় দফায় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলেও এখনো নৌ যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। যুদ্ধ শুরুর আগের সঙ্গে তুলনা করলে এই পথে জাহাজ চলাচল নেমে এসেছে ১০ শতাংশের দিকে।

ইরান মূলত এই যুদ্ধে নিজেদের সামরিক শক্তির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে চলেছে একটি অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের ছয় মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম এখন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলার, যা ২০২৫ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।

হরমুজকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এই কৌশলকে ইরানের জন্য বড় সাফল্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সামরিকভাবে বড় ক্ষতি হলেও তেহরান এমন একটি জায়গা ধরে রেখেছে, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোসহ সারা বিশ্বেই বিস্তৃত। ফলে হরমুজ প্রণালি যতদিন ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ততদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নিতেই একাধিকবার ভাবতে হবে।

হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমানের নতুন উদ্যোগ

হরমুজ প্রণালি ঘিরেই অবশ্য এখন সম্ভাব্য সমঝোতার সবচেয়ে বড় ইঙ্গিতটি দেখা যাচ্ছে। ইরান ও ওমান হরমুজে একটি অস্থায়ী বাণিজ্যিক নৌ পথ চালুর কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত রুটের প্রবেশপথ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে হবে এবং বের হওয়ার অংশেরও একটি অংশ ইরানের জলসীমা দিয়ে যাবে।

তবে তেহরান এখনো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ পুরোপুরি খুলবে না। সম্ভাব্য ব্যবস্থায় সামরিক জাহাজ চলাচল বাদ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ হরমুজকে এবার যুদ্ধের অচলাবস্থা ভাঙতে পরীক্ষামূলক একটি দরজা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ইরান।

এ কারণেই কাতার ও পাকিস্তানও আবার মধ্যস্থতায় সক্রিয় হয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরানে গিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন; পাকিস্তানও হরমুজ পুনরায় খোলার জন্য আগের সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।

ইসরায়েল এখন কোথায়?

ইরান যুদ্ধ ঘিরে এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল একটি প্রশ্ন— ইসরায়েল এখন কোথায়?

এ প্রশ্ন অবান্তরও নয়। কারণ ছয় মাস আগে যখন ইরান যুদ্ধের সূচনা, তখন অন্যতম কেন্দ্রীয় সামরিক পক্ষ ছিল ইসরায়েল। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যৌথ হামলার মাধ্যমেই শুরু হয় যুদ্ধ। এমনকি ইসরায়েলের চাপের মুখেই ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াহুড়ো করে যুদ্ধে জড়াতে হয়েছিল বলেও খবর এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

যুদ্ধ শুরুর ওই সময় ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল— ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা হবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের লক্ষ্যের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে, ইরান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাওয়া-পাওয়া এক নয়। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প আর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতাতেও চিড় ধরে।

জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী সমঝোতার সময় সেই বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ইসরায়েল মনে করেছিল, সমঝোতা ইরানের বিরুদ্ধে অর্জিত সামরিক সুবিধাকে নষ্ট করবে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দেন, চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে ইসরায়েল অভিযান চালিয়ে যাবে।

এর ফলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। স্পষ্ট হয়ে যায়, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজছে, সেখানে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বজায় রাখার পক্ষে অনড়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা আরও সামনে এগিয়ে গেলে এগোলে তেলআবিব সেটিকে কতটা মেনে নেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কে জিতল ৬ মাসের যুদ্ধে?

ছয় মাস পেরিয়ে এসেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দৃশ্যমান নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ যুদ্ধে কোনো পক্ষকেই জয়ী বলার সুযোগও নেই। তবে ছয় মাসে যুদ্ধের ফলাফল কী বলছে, এই ছয় মাসে কে কতটা এগিয়ে থাকল, তার একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

ইরান এই যুদ্ধে ভয়াবহ সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো বহাল তবিয়তে টিকে আছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার অংশবিশেষ এখনো অটুট এবং হরমুজের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করার সক্ষমতাও পুরোপুরি ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে তেহরান।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় আঘাত করেছে, কিন্তু যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো অর্জনের কাছাকাছিও যেতে পারেনি। তার ওপর সামরিক ব্যয়, গোলাবারুদের ঘাটতি, ঘাঁটির ক্ষতি আর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ছেই।

ইসরায়েল ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই তার সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের শেষ নিয়ে মতপার্থক্য বাড়ছে। ইরান যুদ্ধে ইসরায়েল এখন কিছুটা হলেও তৃতীয় পক্ষে পরিণত হয়েছে।

সারসংক্ষেপ করে বলা যেতে পারে— ইরান এ যুদ্ধে হারেনি, জয় পায়নি যুক্তরাষ্ট্রও, ইসরায়েল বরং ছিটকে পড়েছে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ এ সমীকরণকে বদলে দেবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

কোন দিকে যাচ্ছে যুদ্ধ?

ছয় মাসের যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় তিন ধরনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা।

প্রথমত, সীমিত পরিসরে সমঝোতা, যার অধীনে পূর্ণাঙ্গ একটি শান্তিচুক্তির বদলে প্রথম ধাপে হরমুজ খুলে দেওয়া, মার্কিন অবরোধ ও কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সীমিত ব্যবস্থা এবং পরে বৃহত্তর আলোচনায় যাওয়া— এমন একটি ধাপে ধাপে সমঝোতা এগিয়ে যেতে পারে। ইরান-ওমানের হরমুজ উদ্যোগ সেই সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিত।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কৌশল, যেখানে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখলে সরাসরি বড় হামলা ছাড়াই যুদ্ধ দীর্ঘ হতে পারে, কারণ হরমুজ প্রণালির ওপর জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার অনেকটা নির্ভরশীল। রয়টার্সের বিশ্লেষণও বলছে, সংঘাতটি এখন অনেকটাই জ্বালানি যুদ্ধের দিকে মোড় নিয়েছে, যেখানে দুপক্ষই পরস্পরের অর্থনৈতিক সহনশীলতা পরীক্ষা করছে।

তৃতীয়ত, ফের সামরিক সংঘাত, যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতে মুখোমুখি হবে। কোনো ভুল হিসাব, হরমুজে বড় ধরনের জাহাজ হামলা, ইসরায়েলি একতরফা অভিযান বা ইরানি পালটা হামলা ফের বড় যুদ্ধের দরজা খুলে দিতে পারে। কারণ জুনের সমঝোতাও শেষ পর্যন্ত টেকেনি।

ছয় মাস আগে যে যুদ্ধকে চার-পাঁচ সপ্তাহের অভিযান হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিই এখন এমন এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ থামানোর জন্যও যুদ্ধের মতোই কঠিন দর-কষাকষি প্রয়োজন। আগামী কয়েক সপ্তাহে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে— হরমুজ কি সমঝোতার দরজা খুলবে, নাকি সেটিই নতুন করে যুদ্ধের আগুন জ্বালাবে?

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

চীনের হামলা ঠেকাতে পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে তাইওয়ানের জোর প্রস্তুতি

সম্প্রতি পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে ভোরের আলো ফোটার আগেই এক যুদ্ধ মহড়ার আয়োজন করে তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী। সবুজ প্লাস্টিক ক্যানিস্টার থেকে ১০৫ মিলিমিটারের গোলা বের করে ৪টি ট্যাংকে লোড করেন সেনাসদস্যরা। বেইজিংয়ের হামলা প্রতিহত করতে এই দ্বীপপুঞ্জে বর্তমানে হাজার হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছেন, যারা যুদ্ধের সম্

১০ ঘণ্টা আগে

লেক অন্টারিওর নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করলেন ট্রাম্প

কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধের মধ্যেই উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ হ্রদ লেক অন্টারিওর নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

১৩ ঘণ্টা আগে

নেপালে আকস্মিক বন্যায় ৪৬৯ মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ হাজার

শুক্রবার ভোরে নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

১৫ ঘণ্টা আগে

ইরান যুদ্ধের ৬ মাসে যে ৬টি বড় পরিবর্তন

ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো মারাত্মকভাবে ব্যাহত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষতি করলেও তেহরানের সরকারকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেনি।

১৯ ঘণ্টা আগে