দিল্লিতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি শেখ হাসিনা, ঢাকা বলছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা সে দেশের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন ওই অভ্যুত্থানের ঠিক দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে। সেখানে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ও করেন তিনি। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঢাকা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, এ ধরনের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননাই নয়, বরং জুলাই বিপ্লবের শহিদদের প্রতিও গুরুতর অসম্মান। পাশাপাশি এ ঘটনা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর বলেও উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়।

বুধবার (৫ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে গণমাধ্যমে এ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শুরু হওয়া ওই অনুষ্ঠানে ঘণ্টাখানেক পর ভার্চুয়ালি যুক্ত হন শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ভিডিও কলে যুক্ত হননি, কেবল তার অডিও শোনা যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। অনুষ্ঠানে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও যুক্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তিনিও বক্তব্য রাখেন এবং সাংবাদিকদের দুয়েকটি প্রশ্নের জবাব দেন।

শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের মতোই বলেন, তিনি ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরতে চান। সাংবাদিকরা তার দেশে ফেরার দিন-তারিখ বা পরিকল্পনা জানতে চাইলে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার দিল্লিতে এ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার খবর আগেই প্রচারিত হয়েছিল। সে খবরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় বাংলাদেশ। ভারত সরকার বারবার দাবি করে আসছে, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থানরত অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমোদন পাচ্ছেন না।

এ অবস্থায় জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে দিল্লির অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়ার বিষয়ে ভারত সরকারকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করলে উপদেষ্টা তাকে বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য যেন প্রচারিত না হয়।

পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক ব্রিফিংয়ে এ প্রসঙ্গে বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

নানা আলোচনার মধ্যেই শেষ পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই প্রথমবার শেখ হাসিনার সরাসরি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন।

এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বুধবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ে অংশ নেন। সেখানে তিনি ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও দেশের জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারমূলক বক্তব্য দেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অনুষ্ঠানটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে— এমন আশঙ্কার কথা আগে থেকেই ভারত সরকারকে জানানো হয়েছিল। সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে অগ্রিম উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও ভারত সরকার এ ধরনের জনসম্মুখের অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, যে দিনে বাংলাদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি পালন করছে, সেই দিন ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহিদদের প্রতি গুরুতর অসম্মান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় নিরীহ বেসামরিক মানুষ, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের যে তথ্য জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত করেছে, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা তা অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ইতিহাসের গতিপথ উল্টে দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

অতীতেও বাংলাদেশের জনগণ এ ধরনের জঘন্য অপচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখনো তা প্রত্যাখ্যান করছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেছে, দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার যুগে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনো কোনো ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হবে না।

একই সঙ্গে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও তার ‘মাফিয়া এন্টারপ্রাইজে’র স্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কখনো হবে না বলেও উল্লেখ করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে।

মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক, পারস্পরিক কল্যাণকর ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

বিজ্ঞপ্তিতে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে সই হওয়া প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডিত আসামি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার বারবার অনুরোধ জানালেও ভারত সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি। বরং, যেকোনো অজুহাতে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিকে গভীরভাবে আঘাত করেছে।

এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর— বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করতে অনুরোধ করে তথ্য বিবরণী প্রকাশ করে মঙ্গলবার। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিএনপি সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জনগণের অধিকার হরণ করছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অতীতে যারা গণতন্ত্র ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হয়েছে।

১ দিন আগে

৮ দফা প্রয়োজনে এক দফায় পরিণত হবে: জামায়াত আমির

শফিকুর রহমান বলেন, ১১ দলীয় লংমার্চ দেখে অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে, জাতির প্রয়োজনে ৮ দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এক দফা আসলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে।

১ দিন আগে

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে চীনের

নতুন করে আলোচনা শুরুর ফলে রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি মানবিক বোঝা হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সংকটে চীনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও ক্রমেই এক জায়গায় এসে মিলছে। আরও স্থিতিশীল রাখাইন রাজ্য চীনের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে লাভজনক হতে পারে।

২ দিন আগে

কোরআনের আলোকে সংবিধান রচনা হতে পারে, কোরআনকে সংবিধান মানা উচিত হবে না: আইনমন্ত্রী

বর্তমান জাতীয় সংসদে সংশোধিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন পাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আইনে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যারা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তৎকালীন আল বদর, তৎকালীন রাজাকার, তৎকালীন মুসলিম লীগ, তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী— এই তৎকালীন শব্দটা আগে

২ দিন আগে
Advertisement