
প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম

আট দফা দাবিতে রাজধানী ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। আজ শনিবার সকাল থেকে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পথসভা হয়। রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় লংমার্চ।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের পর এটি ১১ দলীয় ঐক্যের দ্বিতীয় বড় কর্মসূচি। চট্টগ্রামের ছয় দফার সঙ্গে এবার আরও দুটি দাবি যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জোটের নেতারা পথসভায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, দলীয়করণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের মতো বিষয় সামনে আনেন। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার দাবি না মানলে আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে যাত্রা শুরু
শনিবার সকাল সাতটার দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সমাবেশ শেষে সকাল আটটার দিকে রংপুরের উদ্দেশে গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এর আগে লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলের নেতারা বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছিলেন, কর্মসূচিতে হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত হতে পারে। জোটের পক্ষ থেকে সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয় এবং কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নেতাকর্মীদেরও উসকানির মুখে সংযত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা কারও উসকানিতে পা দেবো না।’ কোনো আঘাত এলেও প্রতিশোধ না নিয়ে কর্মসূচি সফল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের আট দফা এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সরকার যেন সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা নেয়। সেই শিক্ষা নিয়ে সরকার যেন জনগণের দাবি মেনে নেয়। দাবি মানতে ব্যর্থ হলে কোনো চোখরাঙানিতে কাজ হবে না। বিরোধী দল কোনো কিছুতেই পরোয়া করবে না।’
চট্টগ্রামমুখী লংমার্চের পর কারও কারও মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ সফল হওয়ায় অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। এর কিছু লক্ষণ দুই দিন ধরে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে। তারা যেন হতাশ হয়ে মাথা গরম না করে জনতার দাবি মেনে নেয়।’
দলীয় কোনো দাবিতে তারা মাঠে নামেননি দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আজকে ১৮ কোটি মানুষ ১১ দলের সঙ্গে আছে। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ।’
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চ ঘিরে দেশব্যাপী জোয়ার তৈরি হয়েছে এবং কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথা বলেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান।
এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘তারেক রহমানের সরকার বিএনপির সরকার নয়, এটা হাসিনার সরকার। তাকে সাবধান হতে হবে, দেশবাসীকেও সাবধান হতে হবে।’ তিনি বলেন, বিরোধী দল ক্ষমতার লোভে নয়, দেশকে সঠিক পথে আনতে লংমার্চ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী লিখল, সেদিকে না তাকিয়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত হবে বিএনপি।’ তিনি ১১ দলের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলে জানান।
উদ্বোধনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)।
একই সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের অধিকার হরণ ও গণতন্ত্র ধ্বংস করছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘তিনি (তারেক রহমান) কি হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন, সে সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হবে। এরশাদও সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন। তারেক রহমানকে তার যাওয়ার রাস্তা নিজেকে বাছাই করে নিতে হবে।’

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সরকার গুম ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার হরণের পরিবেশ তৈরি করছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় যেসব আইন ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেগুলো ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, লংমার্চের পথে ১১ দলের ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং এতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের লোকজনও যুক্ত ছিলেন। তার ভাষ্য, এসব করে লংমার্চের কর্মসূচি থামানো যাবে না। নাহিদ ইসলাম বলেন, দফা বাড়লেও শেষ পর্যন্ত সব দফা এক দফায় গিয়ে ঠেকবে।
গাজীপুরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ
সকাল পৌনে ১০টার দিকে লংমার্চের গাড়িবহর গাজীপুরের ভোগরা বাইপাসে পৌঁছায়। সেখানে পথসভায় শফিকুর রহমান বলেন, এই কর্মসূচি কোনো দলের একক দাবি নয়। তিনি বলেন, ঘরে ঘরে গ্যাস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট ও হাটবাজারে চাঁদাবাজি বন্ধ, দুর্নীতিমুক্ত দেশ, আধিপত্যবাদের অবসান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবিতে তারা রাস্তায় নেমেছেন।
গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আপনারা গণভোটে হ্যাঁ বলেছিলেন ৭০ শতাংশ মানুষ। সরকার আপনাদের গণভোটকে অগ্রাহ্য করে আপনাদের অপমান করেছে। সেই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমরা নেমেছি। জনগণের রায়ের বাস্তবায়ন ইনশা আল্লাহ এই বাংলার মাটিতে হবে। ওই বিএনপিই করতে বাধ্য হবে। পানি খাবে, কিন্তু ঘোলা করে খাবে।’

তিনি রংপুরকে গণঅভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা উল্লেখ করে বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবিও এই লংমার্চের মাধ্যমে সামনে আনা হচ্ছে।
টাঙ্গাইলে দফা বাড়ানো-কমানোর বার্তা
গাজীপুরের পর গাড়িবহর টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ মোড়ে পৌঁছায়। দুপুর ১২টার দিকে সেখানে পথসভা হয়। বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ছয় দফা আট দফায় পরিণত হয়েছে। জনগণের প্রয়োজনে দফা বাড়তে পারে, আবার জনগণের প্রয়োজনে সব দফা বিলুপ্ত করে এক দফা ঘোষণা করার প্রয়োজন হতে পারে। আপনারা প্রস্তুত আছেন? আজকের লংমার্চ আপনাদের দিকে। আগামীর লংমার্চ এখান থেকে ঢাকার দিকে। প্রস্তুত থাকবেন ইনশা আল্লাহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘নব্য স্বৈরশাসক থেকে দেশকে থেকে মুক্ত করার জন্য আমরা রাস্তায় নেমেছি। এই লড়াই কার জন্য? জনগণের জন্য, আঠারো কোটি মানুষের জন্য। এ লড়াইয়ের আওয়াজ নিয়ে আমরা রাস্তায় নেমেছি। আপনাদের দাবি আদায় করে ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ। এর মাঝখানে আর কোনো বিশ্রাম নাই, বিরতি নাই।’
বিএনপি সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘৭০ শতাংশ মানুষের ভোটের রায়কে কেন আপনারা সম্মান করলেন না? আপনারা কথা দিয়েছিলেন, কোনো জায়গায় অনির্বাচিত কাউকে দিয়ে শাসন করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু জায়গায় জায়গায় আপনারা প্রশাসক বসিয়েছেন। আপনারা জাতির সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছেন। আপনারা জাতির সঙ্গে দেওয়া একটি কথাও রক্ষা করেননি। এই জাতি আপনাদের কাছে এই কার্ড, সেই কার্ড চায় নাই। এই কার্ডগুলোর কথা আপনারা বলেছিলেন, জাতিকে দেবেন। জাতি যা চেয়েছিল, তা আপনারা দিতে পারেন নাই।’
পথসভায় অলি আহমদ, নাহিদ ইসলাম, মামুনুল হক, মজিবুর রহমান মঞ্জু ও মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।
যমুনা সেতু পার হয়েছে প্রায় সাড়ে চার শ গাড়ি
টাঙ্গাইলের পথসভা শেষে লংমার্চের গাড়িবহর উত্তরবঙ্গের দিকে রওনা হয়। দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে মূল বহরটি যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের টোল প্লাজায় পৌঁছায়। এরপর বিভিন্ন লেন দিয়ে গাড়িগুলো সেতু পার হতে শুরু করে। দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত মূল বহরের গাড়িগুলো উত্তরবঙ্গের দিকে চলে যায়।
যমুনা সেতুর টোল প্লাজা সূত্রের হিসাবে, মূল বহরের আগে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গাড়ি এবং মূল বহর পার হওয়ার পরও লংমার্চের স্টিকারযুক্ত কিছু গাড়ি সেতু পার হয়। সব মিলিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি গাড়ি যমুনা সেতু পার হয়েছে বলে টোল প্লাজা সূত্র জানিয়েছে।
সিরাজগঞ্জে এক দফার হুঁশিয়ারি
দুপুর ১২টার দিকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় পথসভা করেন ১১ দলের নেতারা। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন কোনো দল ও গোষ্ঠীর জন্য না; ১৮ কোটি মানুষের দাবি আদায় নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছি। যদি দাবি আদায় না হয় যেকোনো সময় এক দফার আন্দোলনে যাব। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি সব ক্ষেত্রে দলীয়করণের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন শুরু করেছে। কিন্তু আমরা ভয় পাই না। কারণ, আমরা চব্বিশের সন্তান। চব্বিশে গণঅভ্যুত্থানে করে আপনারা দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে কোনো স্বৈরাচারের জায়গা হবে না। এই সরকার স্বৈরাচার হয়ে উঠবে যদি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কৃষকের সার নিশ্চিত করতে না পারে। আমরা এসব দাবি আদায়ে লংমার্চ করছি।’
বগুড়ায় কৃষি, বেকারত্ব ও জ্বালানি সংকট
দুপুর গড়িয়ে লংমার্চের গাড়িবহর বগুড়ায় পৌঁছায়। বিকেল পৌনে চারটার দিকে শেরপুরের ধুনট রোড বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভায় শফিকুর রহমান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “কৃষকের কাছে সার নেই, পেটে ভাত নেই, যুবকের কাজ নেই, বাড়িতে কোনো নিরাপত্তা নেই, ব্যাংকে টাকা নেই; অথচ একদল শুধু ‘খাই খাই’ জিকিরে ব্যস্ত।”
তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্য ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ দিশাহারা। কৃষি খাত সংকটে রয়েছে, যুবসমাজ বেকারত্বের ভার বহন করছে এবং আর্থিক খাতও সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষায় জনগণের ‘ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে’র প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির।
শেরপুর শহরের করতোয়া বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে পৃথক পথসভা করে এনসিপি। সেখানে নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রতি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
এরপর বিকেল পাঁচটার দিকে বগুড়া মহানগরের মাটিডালি মোড়ে লংমার্চের আরেকটি পথসভা হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আমাদের জায়গায় আছি, আপনারা জায়গা পরিবর্তন করলেন কেন? জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলেন কেন? আপনারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করলে আজকে লংমার্চের প্রয়োজন হতো না। সাত মাস চলে গেছে, সংসদে তিনটি অধিবেশন অতিক্রান্ত হলো। আপনারা জুলাই শহিদদের যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করেছেন, আপনারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেন নাই কেন?’
জ্বালানি সংকট নিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা বলেছিলেন গ্যাস দেবেন, বিদ্যুৎ দেবেন। এখন যিনি মহামান্য প্রেসিডেন্ট, তিনি তখন বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন মাঠে-ময়দানে। তার স্লোগান ছিল, ‘গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।’ এখন আমাদের স্লোগান হলো— ‘গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।’ আমরা নতুন কোনো স্লোগান দিচ্ছি না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব যে স্লোগান দিতেন, সেটাই আমরা বলছি। আপনারা গ্যাস-বিদ্যুৎ দিচ্ছেন না বলেই আজকে আমাদের লংমার্চ।”
মাটিডালির পথসভায় নাহিদ ইসলাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তানের নিখোঁজ ও পরে মৃত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ ছিল। আজকে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ ঘটনা শুধু একটিমাত্র ঘটনা নয়; এ সরকারের আমলে কয়েক হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাদের অনেককে এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। জনগণের কোনো নিরাপত্তা নেই। রাস্তাঘাটে চলার সময় মা-বোনের নিরাপত্তা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী এর দায় নেবেন না? সালাহউদ্দিন সাহেবের যদি ন্যূনতম লজ্জাবোধ থাকে, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
গণভোটের ফল নিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা লংমার্চ করছি কিসের দাবিতে? গণভোটের গণরায়ের দাবিতে। যে গণরায় আপনারা দিয়েছিলেন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। দুটি ভোটের একটি ভোট তারা চুরি করে নিয়েছে। ভোট চুরি করে সরকার গঠন করেছে। অন্যটির ফলাফল তারা এখন অস্বীকার করে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে। আপনাদের আমরা কথা দিতে এসেছি। একটি ভোটের রায় আমরা রক্ষা করতে না পারলেও গণভোটে যে রায় আপনারা দিয়েছেন, আমরা সেই রায় জীবন দিয়ে হলেও বাংলার মাটিতে বাস্তবায়ন করব।’
গাইবান্ধায় দফা বাড়ানোর হুঁশিয়ারি
সন্ধ্যা সাতটার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী সদরের চৌমাথা মোড়ে পথসভা করেন ১১ দলের নেতারা। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি সরকার দাবি মেনে নেয়, তাহলে আমাদের লংমার্চ কিংবা কোনো কর্মসূচি পালন করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু দাবি না মানলে আজকে ৮ দফা, কালকে হতে পারে ৯ দফা, এরপরে যুক্ত হতে পারে ১০ দফা— আমরা জানি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব দফা পরিণত হবে এক দফাতে। আমরা সেই এক দফা এখন চাচ্ছি না। আমরা সরকারকে সময় দিচ্ছি। শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যদি উদয় না হয়, তাহলে ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সয়ে, তব পাপ যেন তারে সমভাবে দহে’ আমরা এই পাপের ভাগ দিতে রাজি হব না।’
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি ও গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নজরুল ইসলাম। এতে অলি আহমদ, মামুনুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, মজিবুর রহমান মঞ্জু, মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও রাশেদ প্রধানসহ জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।
রংপুরে সমাপনী সমাবেশ
সব পথসভা শেষে রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা সেখানে আসতে শুরু করেন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে মাঠ পূর্ণ হয়ে আশপাশের সড়ক ও এলাকাতেও মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। লংমার্চ ঘিরে রংপুর মহানগর ও জেলা পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার ছিল।
রাত ৯টার দিকে শফিকুর রহমান সমাবেশস্থলের মঞ্চে ওঠেন। রাত ৯টা ২০ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করেন এবং প্রায় ১০ মিনিট বক্তব্য দেন।
সমাপনী বক্তব্যে শফিকুর রহমান গণভোট ও সংবিধানের প্রসঙ্গ সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি সাহস করে বলতে পারে না— গণভোট মানি না। তবে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে সংবিধানে গণভোট নাই। সংবিধানে যদি গণভোট না থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচনও নাই, কোনো সরকারও নাই। মানতে হলে সবটাই মানতে হবে, আর না মানলে সব বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন। দেখা যাবে কার বুকের পাটা কতটুকু।’
তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘সংবিধান মেনে ২০২৪-এ গণবিপ্লব হয় নাই। ফ্যাসিস্টদের আপনারা, আমরা সংবিধান অনুসরণ করে তাড়াতে পারি নাই। সংবিধানের বাইরে গিয়ে ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ করা হয়েছে।’
লংমার্চের দাবিগুলো নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ৬ দফা দাবি নিয়ে লংমার্চে নেমেছি। কিন্তু দ্বিতীয় লংমার্চে আরো দুটি দাবি যোগ করেছি। আল্লাহর কসম করে বলছি, এই দাবিগুলো আমাদের কোনো দলের নয়। এই দাবিগুলো দেশের জনগণের— ১৮ কোটি মানুষের দাবি। আমরা এই দাবি বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নেমেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই রংপুরে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ‘হ্যাঁ’ ভোটের অঙ্গিকার রাখলেন না। জনগণ ৭০ ভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোটে ভোট দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গণভোটের রায় মানে নাই। অগ্রাহ্য করেছেন। জাতির কাছে কথা দিয়ে কথা রাখেননি।’
রংপুরের আঞ্চলিক দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও তিনি দীর্ঘ বক্তব্য দেন। শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই অঞ্চলের এক মন্ত্রী নির্বাচনের আগে তিস্তা বাস্তবায়ন নিয়ে আন্দোলন করেছেন। কন্ঠে ‘বাহে জাগো সবায়’। সংসদের ভেতরে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘যে নামেই হোক তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন হবে’। কিন্তু ৭ মাস হয়ে গেল, কোন নড়াচড়া নাই। কোনদিক থেকে কোন পানি পরা খেলেন। এক আর কোমরে জোর দেখি না। জনগণকে ধোঁকা দেওয়া ঠিক হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, ক্ষমতায় গেলে এই তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন করব। কিন্তু নির্বাচনে ভোটের ইঞ্জিনিয়ারিং করে আপনারা ক্ষমতা আসলেন। আমরা অন্যায্য নির্বাচন মেনে নিয়েছি, যাতে দেশটা ভালো চলে। কিন্তু আপনারা যেসব কথা দিয়েছেন সব ভুলে গেছেন। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসে সব ভুলে গেলেন। যে পথে হাসিনা চলে গেছে, সেই পথ ধরেই বর্তমান সরকার হাঁটছে। যদি একই পথে হাঁটেন, তাহলে পরিণতি একই হবে।’
রংপুরের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘সারাদেশের মতো রংপুরেও বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। তবে চাঁদাবাজি আছে। কেউ কাজ না পেলেও একটি দলের কর্মীরা কিন্তু কাজ ঠিকই পাচ্ছে। দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে এই সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে।’
সমাপনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। এতে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রংপুর-বদরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম।
আট দফার বিস্তৃতি
১১ দলীয় ঐক্যের এই লংমার্চে যে আট দফা দাবি সামনে আনা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন, জুলাই গণহত্যার বিচার, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারসংকটের সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চে ছয়টি দাবি ছিল। রংপুরমুখী কর্মসূচিতে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি যুক্ত করে আট দফা করা হয়। ফলে এবারের কর্মসূচিতে জাতীয় রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের একটি দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক দাবিও সামনে এসেছে।
সামনে আরও কর্মসূচি
১১ দলীয় ঐক্যের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে আরও দুটি লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে। এর পর ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণাও দিয়েছে জোট। জোটের সূত্র অনুযায়ী, ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর বাইরে আরও কয়েকটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ হতে পারে।
জোটের নেতারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত দাবিগুলো তুলে ধরাই ধারাবাহিক লংমার্চের অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি জুলাই সনদ মেনে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়টিও তারা সামনে রাখছে। ফলে ঢাকা–রংপুর লংমার্চে একদিকে জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির মতো জাতীয় ইস্যু, অন্যদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো আঞ্চলিক দাবিকে একই কর্মসূচির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে ১১ দলীয় ঐক্য।

আট দফা দাবিতে রাজধানী ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। আজ শনিবার সকাল থেকে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পথসভা হয়। রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় লংমার্চ।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের পর এটি ১১ দলীয় ঐক্যের দ্বিতীয় বড় কর্মসূচি। চট্টগ্রামের ছয় দফার সঙ্গে এবার আরও দুটি দাবি যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জোটের নেতারা পথসভায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, দলীয়করণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের মতো বিষয় সামনে আনেন। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার দাবি না মানলে আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে যাত্রা শুরু
শনিবার সকাল সাতটার দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সমাবেশ শেষে সকাল আটটার দিকে রংপুরের উদ্দেশে গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এর আগে লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলের নেতারা বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছিলেন, কর্মসূচিতে হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত হতে পারে। জোটের পক্ষ থেকে সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয় এবং কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নেতাকর্মীদেরও উসকানির মুখে সংযত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা কারও উসকানিতে পা দেবো না।’ কোনো আঘাত এলেও প্রতিশোধ না নিয়ে কর্মসূচি সফল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের আট দফা এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সরকার যেন সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা নেয়। সেই শিক্ষা নিয়ে সরকার যেন জনগণের দাবি মেনে নেয়। দাবি মানতে ব্যর্থ হলে কোনো চোখরাঙানিতে কাজ হবে না। বিরোধী দল কোনো কিছুতেই পরোয়া করবে না।’
চট্টগ্রামমুখী লংমার্চের পর কারও কারও মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ সফল হওয়ায় অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। এর কিছু লক্ষণ দুই দিন ধরে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে। তারা যেন হতাশ হয়ে মাথা গরম না করে জনতার দাবি মেনে নেয়।’
দলীয় কোনো দাবিতে তারা মাঠে নামেননি দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আজকে ১৮ কোটি মানুষ ১১ দলের সঙ্গে আছে। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ।’
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চ ঘিরে দেশব্যাপী জোয়ার তৈরি হয়েছে এবং কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথা বলেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান।
এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘তারেক রহমানের সরকার বিএনপির সরকার নয়, এটা হাসিনার সরকার। তাকে সাবধান হতে হবে, দেশবাসীকেও সাবধান হতে হবে।’ তিনি বলেন, বিরোধী দল ক্ষমতার লোভে নয়, দেশকে সঠিক পথে আনতে লংমার্চ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী লিখল, সেদিকে না তাকিয়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত হবে বিএনপি।’ তিনি ১১ দলের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলে জানান।
উদ্বোধনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)।
একই সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের অধিকার হরণ ও গণতন্ত্র ধ্বংস করছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘তিনি (তারেক রহমান) কি হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন, সে সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হবে। এরশাদও সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন। তারেক রহমানকে তার যাওয়ার রাস্তা নিজেকে বাছাই করে নিতে হবে।’

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সরকার গুম ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিকার হরণের পরিবেশ তৈরি করছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় যেসব আইন ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেগুলো ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, লংমার্চের পথে ১১ দলের ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং এতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের লোকজনও যুক্ত ছিলেন। তার ভাষ্য, এসব করে লংমার্চের কর্মসূচি থামানো যাবে না। নাহিদ ইসলাম বলেন, দফা বাড়লেও শেষ পর্যন্ত সব দফা এক দফায় গিয়ে ঠেকবে।
গাজীপুরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ
সকাল পৌনে ১০টার দিকে লংমার্চের গাড়িবহর গাজীপুরের ভোগরা বাইপাসে পৌঁছায়। সেখানে পথসভায় শফিকুর রহমান বলেন, এই কর্মসূচি কোনো দলের একক দাবি নয়। তিনি বলেন, ঘরে ঘরে গ্যাস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট ও হাটবাজারে চাঁদাবাজি বন্ধ, দুর্নীতিমুক্ত দেশ, আধিপত্যবাদের অবসান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবিতে তারা রাস্তায় নেমেছেন।
গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আপনারা গণভোটে হ্যাঁ বলেছিলেন ৭০ শতাংশ মানুষ। সরকার আপনাদের গণভোটকে অগ্রাহ্য করে আপনাদের অপমান করেছে। সেই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমরা নেমেছি। জনগণের রায়ের বাস্তবায়ন ইনশা আল্লাহ এই বাংলার মাটিতে হবে। ওই বিএনপিই করতে বাধ্য হবে। পানি খাবে, কিন্তু ঘোলা করে খাবে।’

তিনি রংপুরকে গণঅভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা উল্লেখ করে বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবিও এই লংমার্চের মাধ্যমে সামনে আনা হচ্ছে।
টাঙ্গাইলে দফা বাড়ানো-কমানোর বার্তা
গাজীপুরের পর গাড়িবহর টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ মোড়ে পৌঁছায়। দুপুর ১২টার দিকে সেখানে পথসভা হয়। বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ছয় দফা আট দফায় পরিণত হয়েছে। জনগণের প্রয়োজনে দফা বাড়তে পারে, আবার জনগণের প্রয়োজনে সব দফা বিলুপ্ত করে এক দফা ঘোষণা করার প্রয়োজন হতে পারে। আপনারা প্রস্তুত আছেন? আজকের লংমার্চ আপনাদের দিকে। আগামীর লংমার্চ এখান থেকে ঢাকার দিকে। প্রস্তুত থাকবেন ইনশা আল্লাহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘নব্য স্বৈরশাসক থেকে দেশকে থেকে মুক্ত করার জন্য আমরা রাস্তায় নেমেছি। এই লড়াই কার জন্য? জনগণের জন্য, আঠারো কোটি মানুষের জন্য। এ লড়াইয়ের আওয়াজ নিয়ে আমরা রাস্তায় নেমেছি। আপনাদের দাবি আদায় করে ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ। এর মাঝখানে আর কোনো বিশ্রাম নাই, বিরতি নাই।’
বিএনপি সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘৭০ শতাংশ মানুষের ভোটের রায়কে কেন আপনারা সম্মান করলেন না? আপনারা কথা দিয়েছিলেন, কোনো জায়গায় অনির্বাচিত কাউকে দিয়ে শাসন করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু জায়গায় জায়গায় আপনারা প্রশাসক বসিয়েছেন। আপনারা জাতির সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছেন। আপনারা জাতির সঙ্গে দেওয়া একটি কথাও রক্ষা করেননি। এই জাতি আপনাদের কাছে এই কার্ড, সেই কার্ড চায় নাই। এই কার্ডগুলোর কথা আপনারা বলেছিলেন, জাতিকে দেবেন। জাতি যা চেয়েছিল, তা আপনারা দিতে পারেন নাই।’
পথসভায় অলি আহমদ, নাহিদ ইসলাম, মামুনুল হক, মজিবুর রহমান মঞ্জু ও মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।
যমুনা সেতু পার হয়েছে প্রায় সাড়ে চার শ গাড়ি
টাঙ্গাইলের পথসভা শেষে লংমার্চের গাড়িবহর উত্তরবঙ্গের দিকে রওনা হয়। দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে মূল বহরটি যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের টোল প্লাজায় পৌঁছায়। এরপর বিভিন্ন লেন দিয়ে গাড়িগুলো সেতু পার হতে শুরু করে। দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত মূল বহরের গাড়িগুলো উত্তরবঙ্গের দিকে চলে যায়।
যমুনা সেতুর টোল প্লাজা সূত্রের হিসাবে, মূল বহরের আগে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গাড়ি এবং মূল বহর পার হওয়ার পরও লংমার্চের স্টিকারযুক্ত কিছু গাড়ি সেতু পার হয়। সব মিলিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি গাড়ি যমুনা সেতু পার হয়েছে বলে টোল প্লাজা সূত্র জানিয়েছে।
সিরাজগঞ্জে এক দফার হুঁশিয়ারি
দুপুর ১২টার দিকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় পথসভা করেন ১১ দলের নেতারা। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন কোনো দল ও গোষ্ঠীর জন্য না; ১৮ কোটি মানুষের দাবি আদায় নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছি। যদি দাবি আদায় না হয় যেকোনো সময় এক দফার আন্দোলনে যাব। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি সব ক্ষেত্রে দলীয়করণের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন শুরু করেছে। কিন্তু আমরা ভয় পাই না। কারণ, আমরা চব্বিশের সন্তান। চব্বিশে গণঅভ্যুত্থানে করে আপনারা দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে কোনো স্বৈরাচারের জায়গা হবে না। এই সরকার স্বৈরাচার হয়ে উঠবে যদি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কৃষকের সার নিশ্চিত করতে না পারে। আমরা এসব দাবি আদায়ে লংমার্চ করছি।’
বগুড়ায় কৃষি, বেকারত্ব ও জ্বালানি সংকট
দুপুর গড়িয়ে লংমার্চের গাড়িবহর বগুড়ায় পৌঁছায়। বিকেল পৌনে চারটার দিকে শেরপুরের ধুনট রোড বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভায় শফিকুর রহমান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “কৃষকের কাছে সার নেই, পেটে ভাত নেই, যুবকের কাজ নেই, বাড়িতে কোনো নিরাপত্তা নেই, ব্যাংকে টাকা নেই; অথচ একদল শুধু ‘খাই খাই’ জিকিরে ব্যস্ত।”
তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্য ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ দিশাহারা। কৃষি খাত সংকটে রয়েছে, যুবসমাজ বেকারত্বের ভার বহন করছে এবং আর্থিক খাতও সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষায় জনগণের ‘ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে’র প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির।
শেরপুর শহরের করতোয়া বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে পৃথক পথসভা করে এনসিপি। সেখানে নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রতি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
এরপর বিকেল পাঁচটার দিকে বগুড়া মহানগরের মাটিডালি মোড়ে লংমার্চের আরেকটি পথসভা হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আমাদের জায়গায় আছি, আপনারা জায়গা পরিবর্তন করলেন কেন? জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলেন কেন? আপনারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করলে আজকে লংমার্চের প্রয়োজন হতো না। সাত মাস চলে গেছে, সংসদে তিনটি অধিবেশন অতিক্রান্ত হলো। আপনারা জুলাই শহিদদের যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করেছেন, আপনারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেন নাই কেন?’
জ্বালানি সংকট নিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা বলেছিলেন গ্যাস দেবেন, বিদ্যুৎ দেবেন। এখন যিনি মহামান্য প্রেসিডেন্ট, তিনি তখন বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন মাঠে-ময়দানে। তার স্লোগান ছিল, ‘গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।’ এখন আমাদের স্লোগান হলো— ‘গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে।’ আমরা নতুন কোনো স্লোগান দিচ্ছি না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব যে স্লোগান দিতেন, সেটাই আমরা বলছি। আপনারা গ্যাস-বিদ্যুৎ দিচ্ছেন না বলেই আজকে আমাদের লংমার্চ।”
মাটিডালির পথসভায় নাহিদ ইসলাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তানের নিখোঁজ ও পরে মৃত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ ছিল। আজকে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ ঘটনা শুধু একটিমাত্র ঘটনা নয়; এ সরকারের আমলে কয়েক হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাদের অনেককে এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। জনগণের কোনো নিরাপত্তা নেই। রাস্তাঘাটে চলার সময় মা-বোনের নিরাপত্তা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী এর দায় নেবেন না? সালাহউদ্দিন সাহেবের যদি ন্যূনতম লজ্জাবোধ থাকে, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
গণভোটের ফল নিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা লংমার্চ করছি কিসের দাবিতে? গণভোটের গণরায়ের দাবিতে। যে গণরায় আপনারা দিয়েছিলেন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। দুটি ভোটের একটি ভোট তারা চুরি করে নিয়েছে। ভোট চুরি করে সরকার গঠন করেছে। অন্যটির ফলাফল তারা এখন অস্বীকার করে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে। আপনাদের আমরা কথা দিতে এসেছি। একটি ভোটের রায় আমরা রক্ষা করতে না পারলেও গণভোটে যে রায় আপনারা দিয়েছেন, আমরা সেই রায় জীবন দিয়ে হলেও বাংলার মাটিতে বাস্তবায়ন করব।’
গাইবান্ধায় দফা বাড়ানোর হুঁশিয়ারি
সন্ধ্যা সাতটার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী সদরের চৌমাথা মোড়ে পথসভা করেন ১১ দলের নেতারা। সেখানে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি সরকার দাবি মেনে নেয়, তাহলে আমাদের লংমার্চ কিংবা কোনো কর্মসূচি পালন করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু দাবি না মানলে আজকে ৮ দফা, কালকে হতে পারে ৯ দফা, এরপরে যুক্ত হতে পারে ১০ দফা— আমরা জানি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব দফা পরিণত হবে এক দফাতে। আমরা সেই এক দফা এখন চাচ্ছি না। আমরা সরকারকে সময় দিচ্ছি। শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যদি উদয় না হয়, তাহলে ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সয়ে, তব পাপ যেন তারে সমভাবে দহে’ আমরা এই পাপের ভাগ দিতে রাজি হব না।’
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি ও গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নজরুল ইসলাম। এতে অলি আহমদ, মামুনুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, মজিবুর রহমান মঞ্জু, মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও রাশেদ প্রধানসহ জোটের নেতারা বক্তব্য দেন।
রংপুরে সমাপনী সমাবেশ
সব পথসভা শেষে রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা সেখানে আসতে শুরু করেন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে মাঠ পূর্ণ হয়ে আশপাশের সড়ক ও এলাকাতেও মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। লংমার্চ ঘিরে রংপুর মহানগর ও জেলা পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার ছিল।
রাত ৯টার দিকে শফিকুর রহমান সমাবেশস্থলের মঞ্চে ওঠেন। রাত ৯টা ২০ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করেন এবং প্রায় ১০ মিনিট বক্তব্য দেন।
সমাপনী বক্তব্যে শফিকুর রহমান গণভোট ও সংবিধানের প্রসঙ্গ সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি সাহস করে বলতে পারে না— গণভোট মানি না। তবে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে সংবিধানে গণভোট নাই। সংবিধানে যদি গণভোট না থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচনও নাই, কোনো সরকারও নাই। মানতে হলে সবটাই মানতে হবে, আর না মানলে সব বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন। দেখা যাবে কার বুকের পাটা কতটুকু।’
তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘সংবিধান মেনে ২০২৪-এ গণবিপ্লব হয় নাই। ফ্যাসিস্টদের আপনারা, আমরা সংবিধান অনুসরণ করে তাড়াতে পারি নাই। সংবিধানের বাইরে গিয়ে ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ করা হয়েছে।’
লংমার্চের দাবিগুলো নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ৬ দফা দাবি নিয়ে লংমার্চে নেমেছি। কিন্তু দ্বিতীয় লংমার্চে আরো দুটি দাবি যোগ করেছি। আল্লাহর কসম করে বলছি, এই দাবিগুলো আমাদের কোনো দলের নয়। এই দাবিগুলো দেশের জনগণের— ১৮ কোটি মানুষের দাবি। আমরা এই দাবি বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নেমেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই রংপুরে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ‘হ্যাঁ’ ভোটের অঙ্গিকার রাখলেন না। জনগণ ৭০ ভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোটে ভোট দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গণভোটের রায় মানে নাই। অগ্রাহ্য করেছেন। জাতির কাছে কথা দিয়ে কথা রাখেননি।’
রংপুরের আঞ্চলিক দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও তিনি দীর্ঘ বক্তব্য দেন। শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই অঞ্চলের এক মন্ত্রী নির্বাচনের আগে তিস্তা বাস্তবায়ন নিয়ে আন্দোলন করেছেন। কন্ঠে ‘বাহে জাগো সবায়’। সংসদের ভেতরে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘যে নামেই হোক তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন হবে’। কিন্তু ৭ মাস হয়ে গেল, কোন নড়াচড়া নাই। কোনদিক থেকে কোন পানি পরা খেলেন। এক আর কোমরে জোর দেখি না। জনগণকে ধোঁকা দেওয়া ঠিক হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, ক্ষমতায় গেলে এই তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন করব। কিন্তু নির্বাচনে ভোটের ইঞ্জিনিয়ারিং করে আপনারা ক্ষমতা আসলেন। আমরা অন্যায্য নির্বাচন মেনে নিয়েছি, যাতে দেশটা ভালো চলে। কিন্তু আপনারা যেসব কথা দিয়েছেন সব ভুলে গেছেন। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসে সব ভুলে গেলেন। যে পথে হাসিনা চলে গেছে, সেই পথ ধরেই বর্তমান সরকার হাঁটছে। যদি একই পথে হাঁটেন, তাহলে পরিণতি একই হবে।’
রংপুরের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘সারাদেশের মতো রংপুরেও বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। তবে চাঁদাবাজি আছে। কেউ কাজ না পেলেও একটি দলের কর্মীরা কিন্তু কাজ ঠিকই পাচ্ছে। দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে এই সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে।’
সমাপনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। এতে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রংপুর-বদরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম।
আট দফার বিস্তৃতি
১১ দলীয় ঐক্যের এই লংমার্চে যে আট দফা দাবি সামনে আনা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন, জুলাই গণহত্যার বিচার, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারসংকটের সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চে ছয়টি দাবি ছিল। রংপুরমুখী কর্মসূচিতে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি যুক্ত করে আট দফা করা হয়। ফলে এবারের কর্মসূচিতে জাতীয় রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের একটি দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক দাবিও সামনে এসেছে।
সামনে আরও কর্মসূচি
১১ দলীয় ঐক্যের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে আরও দুটি লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে। এর পর ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণাও দিয়েছে জোট। জোটের সূত্র অনুযায়ী, ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর বাইরে আরও কয়েকটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ হতে পারে।
জোটের নেতারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত দাবিগুলো তুলে ধরাই ধারাবাহিক লংমার্চের অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি জুলাই সনদ মেনে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়টিও তারা সামনে রাখছে। ফলে ঢাকা–রংপুর লংমার্চে একদিকে জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির মতো জাতীয় ইস্যু, অন্যদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো আঞ্চলিক দাবিকে একই কর্মসূচির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে ১১ দলীয় ঐক্য।

শফিকুর রহমান বলেন, ১১ দলীয় লংমার্চ দেখে অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে, জাতির প্রয়োজনে ৮ দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এক দফা আসলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে।
১৭ ঘণ্টা আগে
নতুন করে আলোচনা শুরুর ফলে রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি মানবিক বোঝা হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সংকটে চীনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও ক্রমেই এক জায়গায় এসে মিলছে। আরও স্থিতিশীল রাখাইন রাজ্য চীনের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে লাভজনক হতে পারে।
১ দিন আগে
বর্তমান জাতীয় সংসদে সংশোধিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন পাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আইনে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যারা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তৎকালীন আল বদর, তৎকালীন রাজাকার, তৎকালীন মুসলিম লীগ, তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী— এই তৎকালীন শব্দটা আগে
১ দিন আগে
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আবদুর রাজ্জাকের মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান এবং জাতির কাছে দেওয়া বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তার সেই অবস্থান আরও আগে স্পষ্টভাবে সামনে এলে এ বিষয়ে অনেক প্রশ্নের অবসান হতে পারত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১ দিন আগে