
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ভারতের অন্যতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা আবার দিতে হবে— এই আশঙ্কাই ১৯ বছর বয়সী শেখ সানার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। পরীক্ষার আগের দিন নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে তিনি একটি সাদা কাগজে লিখেছিলেন, ‘আমি দুঃখিত’। এরপর তিনি আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শেখ সানার মৃত্যু এবং মেডিকেল কলেজে ভর্তি-ইচ্ছুক আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা দেশ জুড়ে ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
মে মাসে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। পুনরায় পরীক্ষায় বসতে বাধ্য হওয়া শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জবাবদিহি দাবি করে হাজারও তরুণ রাস্তায় নামেন। এই আন্দোলনের চাপের মুখেই শনিবার (২৫ জুলাই) পদত্যাগ করেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
প্রায় দুই মাস ধরে চলা আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে। পরে তা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে তরুণদের বিস্তৃত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
এবারের নিট পরীক্ষায় দুই কোটির বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে এলে সরকার তদন্ত শুরু করে, ফল প্রকাশ স্থগিত করে এবং জুনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এতে লাখো পরীক্ষার্থীকে আবারও কঠোর প্রস্তুতির মধ্যে ফিরতে হয়।

শেখ সানার পরিবার এবং আত্মহত্যা করা আরও দুই শিক্ষার্থীর পরিবার বলছে, প্রথম পরীক্ষা বাতিল হওয়া এবং পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাই তাদের সন্তানদের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনস্থলে রয়টার্সকে সানার বাবা শেখ জাফফার হুসাইন বলেন, ‘ভয়ই তাকে মেরে ফেলেছে। পুনরায় নিট পরীক্ষা দেওয়ার ভয়।’ আন্দোলনকারীরা সেখানে সরকারের ভূমিকার জবাবদিহি দাবি করছিলেন।
পরীক্ষার্থীদের মৃত্যুর বিষয়ে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও গুজরাটের পুলিশ কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সানা এবং রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা আরও দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। তবে মৃত্যুর কারণ নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেননি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে এসব মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত
মে মাসের মাঝামাঝি ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) জানায়, বেসরকারি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ও দালালদের একটি চক্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন সরবরাহ করেছিল। এ ঘটনায় একজন চিকিৎসক ও কয়েকজন শিক্ষকসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালেও তাদের বিচার করা হবে।
মোদি বলেন, ‘আমি জানি, প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো সাধারণ বিষয় নয়। লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’
আন্দোলনের বিস্তৃতি
গত সোমবার (২০ জুলাই) ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে ‘সংসদে চলো’ কর্মসূচিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী-তরুণ অংশ নেন। পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। একই সময়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও পার্লামেন্টে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেন।
প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলোর কোনো বিচার হয়নি। তার দাবি, গত এক দশকে ১৫০টিরও বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। অতীতের এসব ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও ধর্মেন্দ্র প্রধান বা তার মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি।
দিল্লির আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া জেন-জি সংগঠন সিজেপি দাবি করেছে, পরীক্ষা-সংক্রান্ত এই সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছিলেন, সরকার নিট পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে এবং তরুণদের উদ্বেগ দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি ও ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে সরকার বরাবরই দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন সেই সরকারের জন্যই একটি নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, ‘যখন তরুণরা ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দিল্লির রাস্তায় নেমে আসে, তখন বিষয়টি অনেক বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।’
তবে বিশ্লেষকদের আরেকটি মত হলো, এই আন্দোলনের পরও মোদির জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। গত ১২ বছরে নাগরিকত্ব আইন ও কৃষি সংস্কারসহ বিভিন্ন বড় আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েও তিনি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ক্ষতির শিকার হননি।
তীব্র প্রতিযোগিতার চাপ
ভারতের বহু পরিবারের কাছে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং উন্নত ভবিষ্যতের প্রবেশদ্বার। কারণ দেশটিতে পেশাগত শিক্ষায় সুযোগ সীমিত এবং প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও গত বছর সরকারি হিসাবে ভারতে তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান।
সন্তানকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন পূরণে অনেক পরিবার বছরের পর বছর সঞ্চয় ভেঙে ফেলে। কেউ কেউ ঋণ নিয়েও কোচিং, আবাসন ও পড়াশোনার ব্যয় বহন করেন।
রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার কৃষক রাজেশ কুমার রয়টার্সকে বলেন, ছেলে প্রদীপ কুমারের প্রস্তুতির জন্য তিনি ২৮ লাখ রুপি মূল্যের জমি বিক্রি করেছেন এবং আরও ১১ লাখ রুপি ব্যাংকঋণ নিয়েছেন।
২২ বছর বয়সী প্রদীপ ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তিনি সিকারের একটি কোচিং কেন্দ্রে পড়াশোনা করছিলেন। পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্থগিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই, ১৫ মে তিনি আত্মহত্যা করেন।
নিজের সাধারণ ইটের বাড়ির বাইরে একটি লাল প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে, পাশে বাঁধা একটি বাছুরের দিকে ইঙ্গিত করে রাজেশ কুমার বলেন, ‘আমরা কৃষক, খুব বেশি শিক্ষিত নই। কিন্তু আমার ছেলে সব সময় চিকিৎসক হতে চেয়েছিল।’
তিনি বলেন, ছেলের মৃত্যুর জন্য তিনি ‘শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই’ দায়ী করেন। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ছেলের অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন না বলেও জানান তিনি।
সিজেপি এবং কংগ্রেস আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা অন্য স্বজনদের মতো রাজেশ কুমারও বলেন, তিনি অর্থ চান না।
তিনি বলেন, ‘আমি জবাবদিহি চাই।’
‘সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি’
গুজরাটে ১৭ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী কাহান প্যাটেলও জুনে পুনরায় পরীক্ষার কয়েক দিন আগে আত্মহত্যা করেন। গুজরাটই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য।
কাহানের বাবা প্রশান্ত প্যাটেল বলেন, তার ছেলে চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে চেয়েছিল এবং পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। পুনরায় পরীক্ষার ঘোষণা দেওয়ার পর সে আবার প্রস্তুতি শুরু করলেও অনিশ্চয়তার চাপ আর সামলাতে পারেনি।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি। তাই নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে।’
শিক্ষা আন্দোলনকর্মী এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি নন্দিতা নারায়ণ বলেন, এই আন্দোলন শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ নয়; এটি কলেজে ভর্তি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ, ব্যয়বহুল বেসরকারি কোচিংয়ের বিস্তার এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ‘ভারতের তরুণরা অবশেষে সমস্যাটির গভীরতা উপলব্ধি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।’

ভারতের অন্যতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা আবার দিতে হবে— এই আশঙ্কাই ১৯ বছর বয়সী শেখ সানার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। পরীক্ষার আগের দিন নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে তিনি একটি সাদা কাগজে লিখেছিলেন, ‘আমি দুঃখিত’। এরপর তিনি আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শেখ সানার মৃত্যু এবং মেডিকেল কলেজে ভর্তি-ইচ্ছুক আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা দেশ জুড়ে ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
মে মাসে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। পুনরায় পরীক্ষায় বসতে বাধ্য হওয়া শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জবাবদিহি দাবি করে হাজারও তরুণ রাস্তায় নামেন। এই আন্দোলনের চাপের মুখেই শনিবার (২৫ জুলাই) পদত্যাগ করেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
প্রায় দুই মাস ধরে চলা আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে। পরে তা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে তরুণদের বিস্তৃত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
এবারের নিট পরীক্ষায় দুই কোটির বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে এলে সরকার তদন্ত শুরু করে, ফল প্রকাশ স্থগিত করে এবং জুনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এতে লাখো পরীক্ষার্থীকে আবারও কঠোর প্রস্তুতির মধ্যে ফিরতে হয়।

শেখ সানার পরিবার এবং আত্মহত্যা করা আরও দুই শিক্ষার্থীর পরিবার বলছে, প্রথম পরীক্ষা বাতিল হওয়া এবং পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাই তাদের সন্তানদের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনস্থলে রয়টার্সকে সানার বাবা শেখ জাফফার হুসাইন বলেন, ‘ভয়ই তাকে মেরে ফেলেছে। পুনরায় নিট পরীক্ষা দেওয়ার ভয়।’ আন্দোলনকারীরা সেখানে সরকারের ভূমিকার জবাবদিহি দাবি করছিলেন।
পরীক্ষার্থীদের মৃত্যুর বিষয়ে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও গুজরাটের পুলিশ কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সানা এবং রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা আরও দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। তবে মৃত্যুর কারণ নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেননি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে এসব মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত
মে মাসের মাঝামাঝি ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) জানায়, বেসরকারি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ও দালালদের একটি চক্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন সরবরাহ করেছিল। এ ঘটনায় একজন চিকিৎসক ও কয়েকজন শিক্ষকসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালেও তাদের বিচার করা হবে।
মোদি বলেন, ‘আমি জানি, প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো সাধারণ বিষয় নয়। লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’
আন্দোলনের বিস্তৃতি
গত সোমবার (২০ জুলাই) ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে ‘সংসদে চলো’ কর্মসূচিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী-তরুণ অংশ নেন। পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। একই সময়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও পার্লামেন্টে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেন।
প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলোর কোনো বিচার হয়নি। তার দাবি, গত এক দশকে ১৫০টিরও বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। অতীতের এসব ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও ধর্মেন্দ্র প্রধান বা তার মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি।
দিল্লির আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া জেন-জি সংগঠন সিজেপি দাবি করেছে, পরীক্ষা-সংক্রান্ত এই সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছিলেন, সরকার নিট পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে এবং তরুণদের উদ্বেগ দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি ও ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে সরকার বরাবরই দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন সেই সরকারের জন্যই একটি নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, ‘যখন তরুণরা ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দিল্লির রাস্তায় নেমে আসে, তখন বিষয়টি অনেক বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।’
তবে বিশ্লেষকদের আরেকটি মত হলো, এই আন্দোলনের পরও মোদির জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। গত ১২ বছরে নাগরিকত্ব আইন ও কৃষি সংস্কারসহ বিভিন্ন বড় আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েও তিনি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ক্ষতির শিকার হননি।
তীব্র প্রতিযোগিতার চাপ
ভারতের বহু পরিবারের কাছে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং উন্নত ভবিষ্যতের প্রবেশদ্বার। কারণ দেশটিতে পেশাগত শিক্ষায় সুযোগ সীমিত এবং প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও গত বছর সরকারি হিসাবে ভারতে তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান।
সন্তানকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন পূরণে অনেক পরিবার বছরের পর বছর সঞ্চয় ভেঙে ফেলে। কেউ কেউ ঋণ নিয়েও কোচিং, আবাসন ও পড়াশোনার ব্যয় বহন করেন।
রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার কৃষক রাজেশ কুমার রয়টার্সকে বলেন, ছেলে প্রদীপ কুমারের প্রস্তুতির জন্য তিনি ২৮ লাখ রুপি মূল্যের জমি বিক্রি করেছেন এবং আরও ১১ লাখ রুপি ব্যাংকঋণ নিয়েছেন।
২২ বছর বয়সী প্রদীপ ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তিনি সিকারের একটি কোচিং কেন্দ্রে পড়াশোনা করছিলেন। পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্থগিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই, ১৫ মে তিনি আত্মহত্যা করেন।
নিজের সাধারণ ইটের বাড়ির বাইরে একটি লাল প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে, পাশে বাঁধা একটি বাছুরের দিকে ইঙ্গিত করে রাজেশ কুমার বলেন, ‘আমরা কৃষক, খুব বেশি শিক্ষিত নই। কিন্তু আমার ছেলে সব সময় চিকিৎসক হতে চেয়েছিল।’
তিনি বলেন, ছেলের মৃত্যুর জন্য তিনি ‘শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই’ দায়ী করেন। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ছেলের অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন না বলেও জানান তিনি।
সিজেপি এবং কংগ্রেস আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা অন্য স্বজনদের মতো রাজেশ কুমারও বলেন, তিনি অর্থ চান না।
তিনি বলেন, ‘আমি জবাবদিহি চাই।’
‘সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি’
গুজরাটে ১৭ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী কাহান প্যাটেলও জুনে পুনরায় পরীক্ষার কয়েক দিন আগে আত্মহত্যা করেন। গুজরাটই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য।
কাহানের বাবা প্রশান্ত প্যাটেল বলেন, তার ছেলে চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে চেয়েছিল এবং পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। পুনরায় পরীক্ষার ঘোষণা দেওয়ার পর সে আবার প্রস্তুতি শুরু করলেও অনিশ্চয়তার চাপ আর সামলাতে পারেনি।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘সে আর লড়াই চালিয়ে যেতে পারেনি। তাই নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে।’
শিক্ষা আন্দোলনকর্মী এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি নন্দিতা নারায়ণ বলেন, এই আন্দোলন শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ নয়; এটি কলেজে ভর্তি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ, ব্যয়বহুল বেসরকারি কোচিংয়ের বিস্তার এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ‘ভারতের তরুণরা অবশেষে সমস্যাটির গভীরতা উপলব্ধি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।’

শনিবার (২৫ জুলাই) ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর পৌঁছাতেই দিল্লির যন্তর মন্তরে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা।
১০ ঘণ্টা আগে
বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে দেশ জুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
১১ ঘণ্টা আগে
মোদি সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হলেও তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় ছিলেন। অবশেষে শনিবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে চলমান আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। আন্দোলনকারীরা এটিকে তাদের বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন।
১১ ঘণ্টা আগে
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে অসুস্থতা তাদের আন্দোলনের গতি কমাতে পারবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
১২ ঘণ্টা আগে