ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা নিয়ে শঙ্কায় ইসরায়েল, চুক্তি না হলেও ‘খুশি’

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে)। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, যা যুদ্ধ শুরুর মূল কারণগুলোর অনেকটাই অমীমাংসিত রেখে দেবে— এমন আশঙ্কা করছে ইসরায়েল। দেশটির একাধিক সূত্র মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

মঙ্গলবার সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ বহাল রেখে যদি চুক্তি করা হয় এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের মতো বিষয়গুলো আলোচনার বাইরে রাখা হয়, তাহলে ইসরায়েল এই যুদ্ধকে ‘অসম্পূর্ণ’ মনে করবে।

এক ইসরায়েলি সূত্রের ভাষ্য, ‘সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ট্রাম্প আলোচনায় ক্লান্ত হয়ে শেষ মুহূর্তে ছাড় দিয়ে যেকোনো ধরনের একটি চুক্তি করে ফেলতে পারেন।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছেন যে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের বিষয়টি আলোচনায় থাকবে।

যুদ্ধ চলাকালে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর দিকে এক হাজারের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অসংখ্য ড্রোন হামলা চালায়। ইসরায়েলি ওই সূত্রের মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ককে আলোচনার বাইরে রাখা ‘ঠিক হবে না’।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, আংশিক কোনো চুক্তি থেকে যদি ইরানের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাদ পড়ে এবং একই সঙ্গে এই চুক্তি যদি দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে দেয়, তাহলে তেহরানের সরকার আরও স্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং বিপুল অর্থ প্রবাহের সুযোগ পাবে।

সিএনএন বলছে, এ পরিস্থিতি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থানের পার্থক্যও স্পষ্ট করছে। ট্রাম্প যেখানে আবার যুদ্ধ শুরু করতে অনাগ্রহী বলে মনে হচ্ছে, সেখানে নেতানিয়াহু আশঙ্কা করছেন যুদ্ধটি প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই শেষ হয়ে যেতে পারে।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ইরান ‘ভালোভাবেই জানে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী নয়’ এবং আলোচনায় ‘সব কার্ডই ট্রাম্পের হাতে।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধের কারণে ইরানের বন্দরগুলো প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে।

অলিভিয়া আরও দাবি করেন যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, উৎপাদন কেন্দ্র ভেঙে ফেলা হয়েছে, নৌবাহিনী অকার্যকর হয়েছে এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধ থামলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতা এখনো নিশ্চিত নয়। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এদিকে ইসরায়েলও ফের এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথেই এগোতে চায়।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি অকার্যকর করতে চায়, যাতে তেহরান কখনোই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে না পারে।

কিন্তু ১০ সপ্তাহ পর আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইউরেনিয়াম— বিশেষ করে অস্ত্রমানের কাছাকাছি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।

এই পরিবর্তন নেতানিয়াহুর বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে জেরুজালেমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি ‘গ্রহণযোগ্য’ চুক্তির জন্য পাঁচটি শর্ত দিয়েছিলেন। সেগুলো ছিল— সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ধ্বংস, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুর সমাধান, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং কঠোর পারমাণবিক পরিদর্শন ব্যবস্থা।

কিন্তু গত সপ্তাহে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে দেওয়া ভিডিও বার্তায় তিনি প্রায় সব শর্ত বাদ দিয়ে কেবল একটিতে গুরুত্ব দেন। নেতানিয়াহু বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ইরান থেকে সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং তাদের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ধ্বংস করা।’ এ সময় তিনি লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা গাজার হামাসের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সিএনএনকে সূত্র জানায়, ইসরায়েল বুঝতে পারছে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিষয়গুলো সম্ভবত আলোচনার বাইরে চলে গেছে। এজন্যই নেতানিয়াহু এখন ইউরেনিয়াম ইস্যুকেই সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে দেখছেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের ওপরও অনাস্থা

এক ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, নেতানিয়াহু সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের ওপরই বেশি নির্ভর করছেন। কারণ তিনি ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না।

বর্তমানে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন উইটকফ ও কুশনার। পাশাপাশি পাকিস্তান, কাতার ও ইরান থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে নেতানিয়াহু আলাদা কূটনৈতিক যোগাযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন।

আরেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্প যেন খারাপ কোনো চুক্তিতে না পৌঁছান, সে জন্য ইসরায়েল সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’ তবে তিনি ট্রাম্পকে ফের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন— এমন ধারণা তৈরি হোক, তা চান না নেতানিয়াহু। তাই তিনি কতটা চাপ প্রয়োগ করবেন, সে বিষয়েও সতর্ক।

‘চুক্তি না হলেও খুশি থাকবে’ ইসরায়েল

সিএনএনকে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, আলোচনা ভেঙে গেলে কী হতে পারে, সে বিষয়ে ইসরায়েল এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কোনো চুক্তি না হলেও আমরা খুশি থাকব। হরমুজে অবরোধ চলতে থাকলেও খুশি থাকব। আর ইরানে আরও কয়েকটি হামলা হলেও আমরা খুশি থাকব।’ তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের হাতেই থাকবে বলে স্বীকার করেন তিনি।

আরেক সূত্র জানায়, আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, অবকাঠামো এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনো সমন্বয় করছে।

ইসরায়েলি পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান বোয়াজ বিসমথ সম্প্রতি এক গোপন ব্রিফিংয়ের পর সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘হয় আলোচনা, নয়তো বিস্ফোরণ’।

নতুন চুক্তিতেও পুরনো শঙ্কা

ইসরায়েলি এক সূত্র জানিয়েছে, আলোচনায় তথাকথিত ‘সানসেট ক্লজ’ যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পর কিছু নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং ইরান আবার কিছু পারমাণবিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। সানসেট ক্লজ হলো কোনো চুক্তি বা কর্মসূচির এমন একটি আইনি বিধান, যা একটি নির্দিষ্ট সময় বা শর্ত পূরণের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়।

২০১৫ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে হওয়া ‘ইরান পারমাণবিক চুক্তি’তেও এমন ব্যবস্থা ছিল। জেসিপিওএ (Joint Comprehensive Plan of Action) নামে ওই চুক্তি নিয়ে এর আগে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনই সমালোচনা করেছিলেন। ইসরায়েলের আশঙ্কা, বর্তমান আলোচনাতেও একই ধরনের উপাদান থাকতে পারে।

সূত্রটি জানায়, ইসরায়েল দুটি শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে— ‘সানসেট’ সময়ের পুরোটা জুড়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখা এবং ইরানের ভূগর্ভস্থ ফোরদো ও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত মাসে সতর্ক করে বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে সেটিকে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখা হবে।

রাজনীতি/আইআর

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

টানা ষষ্ঠ রাতে মার্কিন হামলা, পালটা আঘাতের দাবি ইরানের

গত মাসের যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আবারও প্রতিদিনের হামলা-পালটা হামলার পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই ধারাবাহিকতায় টানা ষষ্ঠ রাতের মতো ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে শুক্রবার উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালানোর দাবি

১০ ঘণ্টা আগে

বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা হলে বন্ধ হবে বাব আল-মান্দেব— হুতিদের প্রস্তুত রেখেছে ইরান

হুতিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলে হামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে গোষ্ঠীটি। ইয়েমেনের হোদেইদাহ ও এডেন উপসাগরের দিকে নজর রাখা পার্বত্য এলাকায় এবং লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করেছে। এখন শুধু হামলা শুরুর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে তা

২০ ঘণ্টা আগে

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কঠোর ভিসা নীতি যুক্তরাষ্ট্রের

স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আর অনুমতি ছাড়া তাদের শিক্ষাগত লক্ষ্য পরিবর্তন করতে পারবেন না বা অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হতে পারবেন না। এ ছাড়া ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার জন্য যে ৬০ দিনের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ ছিল, তা কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে।

২০ ঘণ্টা আগে

রিলায়েন্সের সার্ভার হ্যাক, ভারতের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নথি ফাঁস

র‍্যানসমওয়্যার গোষ্ঠী ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ ভারতের শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সার্ভারে সাইবার হামলা চালিয়ে দেশটির বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কুদানকুলাম-সংক্রান্ত হাজারো সংবেদনশীল নথি ফাঁস করেছে।

১ দিন আগে