কুয়েতে ইরানি হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের পালটা আঘাত— পারস্য উপসাগরে তীব্র উত্তেজনা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
যুদ্ধে জড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রতীকী ছবি

পারস্য উপসাগরে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের দামামা। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এক ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৬৩ জন। এর জবাবে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে জোরালো হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। রক্তক্ষয়ী এ সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও তা সফল হওয়ার লক্ষ্মণ খুবই ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার (৩ জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে খবরে বলা হয়েছে, নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে চরম পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ২ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে।

কুয়েত বিমানবন্দরে ইরানি হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের পালটা প্রতিরোধ

কুয়েতের সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা ও কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যালয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই হামলায় এক ভারতীয় নাগরিক নিহত ও অন্তত ৬৩ জন আহত হয়েছেন।

হামলার পর বিমানবন্দরের সমস্ত ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়। পরে কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর কুয়েত এয়ারওয়েজ ও জাজিরা এয়ারওয়েজ পুনরায় তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু করেছে।

এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করে, দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌ বহরের সদর দপ্তর, একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটি ও ‘পানায়া’ নামে একটি জাহাজে সফল হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তাদের ঘাঁটিতে আঘাত হানার বিষয়টি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।

সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের নিক্ষেপ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং ইরানি উসকানির জবাবে তারা দক্ষিণ ইরানে নতুন করে ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি কেশম দ্বীপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও পারস্য উপসাগরে মাইন বিছানোর চেষ্টায় লিপ্ত ইরানি স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে এই মার্কিন হামলা চালানো হয়।

বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে যুদ্ধবিরতি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং বিভিন্ন বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দফায় দফায় হামলা চালিয়ে আসছে। এপ্রিলের শুরুতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধে শুরু থেকেই আলোচিত হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হতো। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান কার্যত এই নৌ পথ বন্ধ করে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালিতে ইরানসংশ্লিষ্ট জাহাজের অবরোধ শুরু করেছে।

গত সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রাথমিক খসড়া চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু জটিল বিষয়গুলো ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য তুলে রাখায় মূল চুক্তিতে এখনো কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সই করেনি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি এক হুঁশিয়ারিতে বলেছেন, আলোচনা কিংবা যুদ্ধবিরতি— কোনো ক্ষেত্রেই ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সীমা লঙ্ঘন’ করতে দেবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গার্গাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, কুয়েত ও বাহরাইনে বারবার এই হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে একটি দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ জবাব দাবি করে। এই আগ্রাসন কেবল একটি দেশকে নয়, বরং আমাদের সবাইকে লক্ষ্য করে করা হচ্ছে।

আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, তিনি যুদ্ধ অবসান ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ সুগম করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তবে তেহরান যেকোনো চুক্তির জন্য লেবাননে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধের শর্তারোপ করেছে।

পাশাপাশি ইরান তাদের আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রির অর্থ ফেরত, অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি জানাচ্ছে।

আমেরিকায় জ্বালানির দাম কমানোর অভ্যন্তরীণ চাপ ও ইরানের কাছে নতি স্বীকার না করার উভয় সংকটে থাকা ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার প্রধান লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

ট্রাম্প আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম বুধবার জানিয়েছে, তেহরান সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রস্তাবের জবাব দেয়নি। লেবানন বিষয়ে ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানও সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।

তবে বুধবার প্রকাশিত এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে এবং এ আলোচনা প্রক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিজেই যুক্ত আছেন।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত

এই বহুমাত্রিক যুদ্ধের ফলে ইরান ও লেবাননে এরই মধ্যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ও নৌ বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে।

এ সংঘাতের জেরে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যেও তীব্র লড়াই চলছে। ইসরায়েলি বাহিনী গত ২৫ বছরের মধ্যে এবারই লেবাননের সবচেয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।

লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন এবং বৈরুতের ঠিক দক্ষিণে একটি গাড়িকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, হিজবুল্লাহর ছোড়া ড্রোন তারা আকাশেই ধ্বংস করেছে।

এ ড্রোন হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মার্কিন মধ্যস্থতায় গত সোমবার ঘোষিত আংশিক যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্প ইসরায়েলকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে আঘাত না করার অনুরোধ জানানোর পর এই গাড়ির ওপর চালানো হামলাটিই বৈরুতের সবচেয়ে কাছাকাছি এলাকায় ঘটা বড় কোনো ইসরায়েলি আক্রমণ।

এদিকে পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও স্বীকার করেছেন, লেবাননের যুদ্ধ নিয়ে ফোনালাপের সময় তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় ‘পাগল’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। নেতানিয়াহুর ডাকনাম উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘ফোনালাপের একপর্যায়ে আমি বলেছিলাম— বিবি, আমাদের এবার এটা থামাতে হবে। আমাদের এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।’

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ব্রেক্সিটের ১০ বছরে ৬ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বিদায়, সপ্তমের অপেক্ষা

ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পূর্তির দিনে সেই রাজনৈতিক যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্ত দেশটির জন্য শুধু একটি পররাষ্ট্র বা অর্থনৈতিক নীতিগত পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যার প্রভাব এখনো দেশটির রাজনীতিতে স্পষ্ট।

১৪ ঘণ্টা আগে

হোয়াইট হাউজে ড্রোন ও স্নাইপার হামলার ষড়যন্ত্র: আরও দুইজন গ্রেপ্তার

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত একটি ইউএফসি ফ্রিডম ২৫০ মিক্সড মার্শাল আর্টস ইভেন্টকে লক্ষ্য করে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ষড়যন্ত্রের ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

১৭ ঘণ্টা আগে

ইরান কথা না শুনলে ‘যা করার করব’— হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তির আওতায় প্রথম দফার আলোচনার পর গতকাল সোমবার থেকে আগামী ৬০ দিনের জন্য ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি এই চুক্তির শর্ত মেনে না চলে, তবে তিনি ‘যা করার তা-ই করবেন’।

১৭ ঘণ্টা আগে

ব্রেক্সিটের এক দশক: ইউরোপ নিয়ে সম্পর্কের জটিলতায় যুক্তরাজ্য

দশ বছর আগের ব্রেক্সিট আলোচনার সময়কার ইউরোপ আর আজকের ইউরোপ এক নয়। তখন মূল প্রশ্ন ছিল যুক্তরাজ্যের বিদায় কীভাবে সামলানো হবে। আর এখন প্রশ্ন— ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা বিশ্বে ইউরোপ কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখবে।

১৮ ঘণ্টা আগে