
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

একবিংশ শতাব্দীর তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছিল, তা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারগুলোর পেছনে বর্তমানে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এই সরকারগুলোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ ও কার্যকর শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চ্যাথাম হাউজে’র এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন দেশের সরকারগুলোর সামনে থাকা ‘ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতা’ ও নানা চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন প্রতিষ্ঠানটির এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ী।
মিল ও অমিলের রাজনীতি
দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু নিজস্ব ভিন্নতা। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ‘আরাগলায়া’ (সংগ্রাম) নামের এক গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে যায় ‘মনসুন রেভল্যুশন’ (জুলাই গণঅভ্যুত্থান)। ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয় দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে নেপালে ‘জেন জি বিপ্লবে’র মুখে পতন ঘটে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির সরকারের।
ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ীর মতে, এই আন্দোলনগুলোর মূল জ্বালানি ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয় (তিনটি দেশই বর্তমানে আইএমএফের ঋণ সহায়তায় চলছে), জনসংখ্যার মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার কারণে সাধারণ মানুষের মনে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল। আর এই গণঅসন্তোষকে স্ফুলিঙ্গে রূপ দিতে এবং সরকারবিরোধী জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
তবে দেশভেদে আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণগুলো আলাদা ছিল। শ্রীলঙ্কায় আরাগলায়ার সূত্রপাত হয়েছিল চরম ঋণসংকট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের তীব্র ঘাটতি থেকে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। আর নেপালে এই আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার একটি সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে।
পরবর্তী সময়ে এই তিন দেশে যে জাতীয় নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়, তার গতিপথও ছিল ভিন্ন। নেপালের জনগণ বেছে নেয় আমূল পরিবর্তন— গত মার্চের নির্বাচনে তারা সাবেক র্যাপ তারকা বালেন্দ্র শাহকে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কিছুটা চেনা পথেই হেঁটেছে; দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমানকে বেছে নেয় জনগণ। তবে রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে ভিন্নতা স্পষ্ট শ্রীলঙ্কায়। নেপাল যেখানে প্রথাগত বামপন্থিদের প্রত্যাখ্যান করেছে, সেখানে শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’ (জেভিপি) নামের একটি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী জোট সরকারের।
বিপ্লব-পরবর্তী অধ্যায় ও মোহভঙ্গ
সম্প্রতি এই তিন দেশে সফরের অভিজ্ঞতা থেকে ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ী জানান, নতুন পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের মনে বিপুল আশাবাদ ও নতুন শুরুর স্বপ্ন ডালপালা মেললেও, দেশ তিনটি এখন প্রায় একই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
সব দেশেই নতুন সরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বা জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসায় এক দারুণ সম্ভাবনার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকার পরও গত অক্টোবরে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদে’র প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো মানুষের মনে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের আশা জাগিয়েছে।
তবে প্রাথমিক সেই উছ্বাস এখন ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করেছে বলে মনে করেন চিয়েতিগজ বাজপেয়ী। তার মতে, সাধারণ মানুষের মনে সংশয় জাগছে— নতুন সরকারগুলো হয়তো প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে কিংবা তাদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে অনভিজ্ঞতার কারণে নতুন শাসকদের নানামুখী ‘ভুল পদক্ষেপ’।
নেপালে বালেন্দ্র শাহ দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও, নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে তার সরকারের দুই মন্ত্রীকে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করতে হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে জনগণের ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল, যা গত বছরের ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’ মোকাবিলায় সরকারের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার কারণে আরও বেড়ে যায়। যার প্রতিফলন ঘটেছে চলতি বছরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের ভোট উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
বাংলাদেশে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ীর মূল্যায়ন— ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ায় সহিংস অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে, ক্ষমতার 'টিকিয়ে রাখতে' নতুন বিএনপি সরকার হয়তো প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদে’র সংস্কারগুলোর কেবল কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পারে। চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই প্রথম বড় পরীক্ষা দিতে হবে ক্ষমতাসীন দলটিকে।
স্থিতিশীলতা এখনো সুদূরপরাহত
চিয়েতিগজ বাজপেয়ীর মতে, বিপুল জনসমর্থন থাকলেই যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় না। বিশেষ করে সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষতগুলোর সমাধান না হলে সংকট কাটানো অসম্ভব।
এই তিন দেশেরই অতীত ইতিহাস সহিংসতা ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভরা। নেপাল এক দশক ধরে মাওবাদী সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছিল। দেশটিতে জাতিভেদ, প্রজন্মগত দূরত্ব, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং আদর্শিক বিভাজন অত্যন্ত প্রকট। ২০১৫ সালের সংবিধানের মাধ্যমে এসব বৈষম্য দূর করার চেষ্টা হলেও, বর্তমান সরকার যদি কেবল তাদের মূল চালিকাশক্তি— অর্থাৎ শহরের তরুণ ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করে, তবে সামাজিক সম্প্রীতি ভেঙে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার নিজেকে জাতিগত রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি; সিংহলি বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ দেশটির সমাজে এখনো গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে সংখ্যালঘু হিন্দু এবং মুসলিম তামিল সম্প্রদায়ের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মেলবন্ধন ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়া এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক মেরুকরণ আবর্তিত হচ্ছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দুই দল— বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের ‘চিরবৈরী’ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। তরুণদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় পক্ষ’ (থার্ড ফ্রন্ট) গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও, গত নির্বাচনে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। আপাতত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়া হলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রতিশোধের সংস্কৃতি ভাঙতে হলে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে কোনো না কোনোভাবে মূল ধারার রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন পড়বে বলে মনে করেন গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ী।
ইরান যুদ্ধ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিল সমীকরণ
অভ্যন্তরীণ এই চাপগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটের কারণে রেশনিং এবং সংকুচিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিন দেশের অর্থনীতিই প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে। একই সঙ্গে, এই দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকাংশেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। ফলস্বরূপ, নির্বাচনের পর নতুন সরকারগুলো যে স্বস্তির সময় পাওয়ার আশা করেছিল, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তা ম্লান হয়ে গেছে।
এর বাইরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ করাও তিন দেশের নতুন সরকারগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা পূর্ববর্তী সরকারগুলোর আমলের সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠন করতে চাইছে।
ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ী মনে করেন, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন তহবিল এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের জন্য এই তিন দেশের কাছেই ভারত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট কাটাতে নয়াদিল্লি তার প্রতিবেশীদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়ে দেওয়ায় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, এই অঞ্চলে ভারতের বিশাল আকার ও প্রভাবের কারণে প্রতিবেশীদের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অবিশ্বাস রয়েই গেছে, যা দূর করা বেশ কঠিন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় লাভ করাটা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য এক মিশ্র বার্তা বহন করছে। একদিকে, এর ফলে নয়াদিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে, যা আগামী ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা, অতীতে তিস্তা বা গঙ্গার পানিবণ্টনের মতো বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের মতবিরোধ প্রায়ই বড় বাধা হিসেবে কাজ করত।
তবে বিপরীত চিত্রও রয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে চারটিতেই এখন বিজেপি বা তাদের জোট শরিকরা ক্ষমতায় থাকায়, দলটির অনেক সময়কার মেরুকরণ ও জাতিগত রাজনীতি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে তিতকুটে করে তুলতে পারে। সম্প্রতি অবৈধ অভিবাসী দমনের নামে সীমান্ত এলাকায় বিজেপি সরকারের কড়াকড়ির কারণে দুই দেশের সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
নেপালে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের 'অননুমেয় ও খামখেয়ালি' নেতৃত্ব নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানানো এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত বিরোধ এর অন্যতম উদাহরণ। যদিও বিজেপি নেপালের ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে (আরএসপি) আতিথেয়তা দিয়ে এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক মিলের ওপর জোর দিয়ে বরফ গলানোর চেষ্টা করছে, তবে এটি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারতের নিজস্ব রাজনীতিও কিন্তু পুরোপুরি ঝঞ্ঝামুক্ত নয় এবং প্রতিবেশীদের মতো জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের চাপ থেকে মুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, তামিলনাড়ু রাজ্যে গত এপ্রিলের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সমর্থনে এক অনামী নতুন রাজনৈতিক দল (তামিলাগা ভেট্টি কাজগাম-টিভিকে) রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকে হটিয়ে জয়লাভ করেছে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তামিলনাড়ুর এই নতুন সরকারের কারণে মাছ ধরার অধিকার ও শ্রীলঙ্কান তামিলদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
এরই মধ্যে ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন জন্ম নিয়েছে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে (যেখানে তিনি বেকার যুবকদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন) ব্যঙ্গ করে অনলাইনে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি সম্প্রতি তাদের প্রথম বিশাল গণসমাবেশ করেছে। ভারতের এই জেন জি আন্দোলন হয়তো প্রতিবেশীদের মতো রাতারাতি সরকার ফেলে দেবে না, তবে তা দেশটির রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন অনিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে।
গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ী তার পর্যালোচনার শেষ অংশে বলেন, সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সরকারগুলো এখন অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির এক গোলকধাঁধায় বন্দি। তারা যদি এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে আবারও তাদের নিজেদেরই নতুন কোনো গণআন্দোলনের মুখে পড়তে হতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীর তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছিল, তা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারগুলোর পেছনে বর্তমানে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এই সরকারগুলোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ ও কার্যকর শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চ্যাথাম হাউজে’র এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন দেশের সরকারগুলোর সামনে থাকা ‘ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতা’ ও নানা চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন প্রতিষ্ঠানটির এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ী।
মিল ও অমিলের রাজনীতি
দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু নিজস্ব ভিন্নতা। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ‘আরাগলায়া’ (সংগ্রাম) নামের এক গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে যায় ‘মনসুন রেভল্যুশন’ (জুলাই গণঅভ্যুত্থান)। ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয় দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে নেপালে ‘জেন জি বিপ্লবে’র মুখে পতন ঘটে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির সরকারের।
ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ীর মতে, এই আন্দোলনগুলোর মূল জ্বালানি ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয় (তিনটি দেশই বর্তমানে আইএমএফের ঋণ সহায়তায় চলছে), জনসংখ্যার মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার কারণে সাধারণ মানুষের মনে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল। আর এই গণঅসন্তোষকে স্ফুলিঙ্গে রূপ দিতে এবং সরকারবিরোধী জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
তবে দেশভেদে আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণগুলো আলাদা ছিল। শ্রীলঙ্কায় আরাগলায়ার সূত্রপাত হয়েছিল চরম ঋণসংকট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের তীব্র ঘাটতি থেকে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। আর নেপালে এই আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার একটি সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে।
পরবর্তী সময়ে এই তিন দেশে যে জাতীয় নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়, তার গতিপথও ছিল ভিন্ন। নেপালের জনগণ বেছে নেয় আমূল পরিবর্তন— গত মার্চের নির্বাচনে তারা সাবেক র্যাপ তারকা বালেন্দ্র শাহকে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কিছুটা চেনা পথেই হেঁটেছে; দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমানকে বেছে নেয় জনগণ। তবে রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে ভিন্নতা স্পষ্ট শ্রীলঙ্কায়। নেপাল যেখানে প্রথাগত বামপন্থিদের প্রত্যাখ্যান করেছে, সেখানে শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’ (জেভিপি) নামের একটি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী জোট সরকারের।
বিপ্লব-পরবর্তী অধ্যায় ও মোহভঙ্গ
সম্প্রতি এই তিন দেশে সফরের অভিজ্ঞতা থেকে ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ী জানান, নতুন পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের মনে বিপুল আশাবাদ ও নতুন শুরুর স্বপ্ন ডালপালা মেললেও, দেশ তিনটি এখন প্রায় একই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
সব দেশেই নতুন সরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বা জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসায় এক দারুণ সম্ভাবনার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকার পরও গত অক্টোবরে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদে’র প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো মানুষের মনে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের আশা জাগিয়েছে।
তবে প্রাথমিক সেই উছ্বাস এখন ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করেছে বলে মনে করেন চিয়েতিগজ বাজপেয়ী। তার মতে, সাধারণ মানুষের মনে সংশয় জাগছে— নতুন সরকারগুলো হয়তো প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে কিংবা তাদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে অনভিজ্ঞতার কারণে নতুন শাসকদের নানামুখী ‘ভুল পদক্ষেপ’।
নেপালে বালেন্দ্র শাহ দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও, নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে তার সরকারের দুই মন্ত্রীকে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করতে হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে জনগণের ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল, যা গত বছরের ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’ মোকাবিলায় সরকারের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার কারণে আরও বেড়ে যায়। যার প্রতিফলন ঘটেছে চলতি বছরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের ভোট উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
বাংলাদেশে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ীর মূল্যায়ন— ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ায় সহিংস অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে, ক্ষমতার 'টিকিয়ে রাখতে' নতুন বিএনপি সরকার হয়তো প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদে’র সংস্কারগুলোর কেবল কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পারে। চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই প্রথম বড় পরীক্ষা দিতে হবে ক্ষমতাসীন দলটিকে।
স্থিতিশীলতা এখনো সুদূরপরাহত
চিয়েতিগজ বাজপেয়ীর মতে, বিপুল জনসমর্থন থাকলেই যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় না। বিশেষ করে সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষতগুলোর সমাধান না হলে সংকট কাটানো অসম্ভব।
এই তিন দেশেরই অতীত ইতিহাস সহিংসতা ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভরা। নেপাল এক দশক ধরে মাওবাদী সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছিল। দেশটিতে জাতিভেদ, প্রজন্মগত দূরত্ব, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং আদর্শিক বিভাজন অত্যন্ত প্রকট। ২০১৫ সালের সংবিধানের মাধ্যমে এসব বৈষম্য দূর করার চেষ্টা হলেও, বর্তমান সরকার যদি কেবল তাদের মূল চালিকাশক্তি— অর্থাৎ শহরের তরুণ ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করে, তবে সামাজিক সম্প্রীতি ভেঙে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার নিজেকে জাতিগত রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি; সিংহলি বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ দেশটির সমাজে এখনো গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে সংখ্যালঘু হিন্দু এবং মুসলিম তামিল সম্প্রদায়ের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মেলবন্ধন ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়া এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক মেরুকরণ আবর্তিত হচ্ছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দুই দল— বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের ‘চিরবৈরী’ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। তরুণদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় পক্ষ’ (থার্ড ফ্রন্ট) গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও, গত নির্বাচনে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। আপাতত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়া হলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রতিশোধের সংস্কৃতি ভাঙতে হলে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে কোনো না কোনোভাবে মূল ধারার রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন পড়বে বলে মনে করেন গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ী।
ইরান যুদ্ধ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিল সমীকরণ
অভ্যন্তরীণ এই চাপগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটের কারণে রেশনিং এবং সংকুচিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিন দেশের অর্থনীতিই প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে। একই সঙ্গে, এই দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকাংশেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। ফলস্বরূপ, নির্বাচনের পর নতুন সরকারগুলো যে স্বস্তির সময় পাওয়ার আশা করেছিল, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তা ম্লান হয়ে গেছে।
এর বাইরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ করাও তিন দেশের নতুন সরকারগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা পূর্ববর্তী সরকারগুলোর আমলের সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠন করতে চাইছে।
ড. চিয়েতিগজ বাজপেয়ী মনে করেন, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন তহবিল এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের জন্য এই তিন দেশের কাছেই ভারত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট কাটাতে নয়াদিল্লি তার প্রতিবেশীদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়ে দেওয়ায় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, এই অঞ্চলে ভারতের বিশাল আকার ও প্রভাবের কারণে প্রতিবেশীদের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অবিশ্বাস রয়েই গেছে, যা দূর করা বেশ কঠিন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় লাভ করাটা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য এক মিশ্র বার্তা বহন করছে। একদিকে, এর ফলে নয়াদিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে, যা আগামী ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা, অতীতে তিস্তা বা গঙ্গার পানিবণ্টনের মতো বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের মতবিরোধ প্রায়ই বড় বাধা হিসেবে কাজ করত।
তবে বিপরীত চিত্রও রয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে চারটিতেই এখন বিজেপি বা তাদের জোট শরিকরা ক্ষমতায় থাকায়, দলটির অনেক সময়কার মেরুকরণ ও জাতিগত রাজনীতি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে তিতকুটে করে তুলতে পারে। সম্প্রতি অবৈধ অভিবাসী দমনের নামে সীমান্ত এলাকায় বিজেপি সরকারের কড়াকড়ির কারণে দুই দেশের সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
নেপালে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের 'অননুমেয় ও খামখেয়ালি' নেতৃত্ব নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানানো এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত বিরোধ এর অন্যতম উদাহরণ। যদিও বিজেপি নেপালের ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে (আরএসপি) আতিথেয়তা দিয়ে এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক মিলের ওপর জোর দিয়ে বরফ গলানোর চেষ্টা করছে, তবে এটি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারতের নিজস্ব রাজনীতিও কিন্তু পুরোপুরি ঝঞ্ঝামুক্ত নয় এবং প্রতিবেশীদের মতো জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের চাপ থেকে মুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, তামিলনাড়ু রাজ্যে গত এপ্রিলের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের সমর্থনে এক অনামী নতুন রাজনৈতিক দল (তামিলাগা ভেট্টি কাজগাম-টিভিকে) রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকে হটিয়ে জয়লাভ করেছে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তামিলনাড়ুর এই নতুন সরকারের কারণে মাছ ধরার অধিকার ও শ্রীলঙ্কান তামিলদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
এরই মধ্যে ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন জন্ম নিয়েছে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে (যেখানে তিনি বেকার যুবকদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন) ব্যঙ্গ করে অনলাইনে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি সম্প্রতি তাদের প্রথম বিশাল গণসমাবেশ করেছে। ভারতের এই জেন জি আন্দোলন হয়তো প্রতিবেশীদের মতো রাতারাতি সরকার ফেলে দেবে না, তবে তা দেশটির রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন অনিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে।
গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ী তার পর্যালোচনার শেষ অংশে বলেন, সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সরকারগুলো এখন অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির এক গোলকধাঁধায় বন্দি। তারা যদি এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে আবারও তাদের নিজেদেরই নতুন কোনো গণআন্দোলনের মুখে পড়তে হতে পারে।

লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা চুক্তিটিকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তরের সম্ভাবনা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। এরপরই এই যুদ্ধবিরতির খবর এলো।
১৯ ঘণ্টা আগে
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জাহাজ পরিচালনাকারীদের হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করার অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সরকারি ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে হবে। আবেদনে জাহাজের সঠিক যোগাযোগ তথ্য, রুট ও সময়সূচি উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে প্রণালিতে প্রবেশ কিংবা বের
২০ ঘণ্টা আগে
সুইজারল্যান্ডে ইরানি ও মার্কিন আলোচনাকারীদের মধ্যে শুক্রবার পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে (এমওইউ) একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই আলোচনার সময়সূচি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছ
২১ ঘণ্টা আগে
আইসিপির তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বেশ কিছু ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় অনেক বিদেশি নাগরিক নির্ধারিত সময়ে নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। মানবিক বিবেচনায় তাদের ওপর আরোপিত ওভারস্টে জরিমানা সাময়িকভাবে মওকুফ করা হয়েছিল।
২১ ঘণ্টা আগে