ইরান কথা না শুনলে ‘যা করার করব’— হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ১২: ৫৮
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তির আওতায় প্রথম দফার আলোচনার পর গতকাল সোমবার থেকে আগামী ৬০ দিনের জন্য ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি এই চুক্তির শর্ত মেনে না চলে, তবে তিনি ‘যা করার তা-ই করবেন’।

এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ডে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই আলোচনা একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য ভালো ভিত্তি তৈরি করেছে। অবশ্য ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা শুরু করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে দুই পক্ষ কাজ করছে। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য একটি রূপরেখা (রোডম্যাপ) তৈরিতে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ।

এ ছাড়া মার্কিন মিত্র ইসরায়েল এবং ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননে চলমান লড়াই বন্ধের একটি কৌশলের (মেকানিজম) ব্যাপারেও তারা একমত হয়েছে। একই সঙ্গে এই কৌশলগত জলপথে সংঘাত এড়াতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে একটি যোগাযোগ লাইন (কমিউনিকেশনস লাইন) চালু করা হয়েছে।

ইরানকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে চুক্তিতে পরিকল্পিত বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের মধ্যে প্রথম হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়) আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে তেহরান অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রি করতে পারবে এবং তার মূল্যও সংগ্রহ করতে পারবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চুক্তির পর পুরো অঞ্চল জুড়ে বৈরিতা অবসানের লক্ষ্যে লেবাননে লড়াইয়ে একটি ধারাবাহিক স্থবিরতা দেখা গেছে। যদিও ইসরায়েল বলেছে যে তারা দক্ষিণ লেবাননে একটি নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখবে এবং ইসরায়েলি সেনা ও নাগরিকদের ওপর হুমকি ‘নিল ডাউন’ (নিষ্ক্রিয়) করতে তাদের অভিযান অব্যাহত রাখবে।

সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল আবার বাড়তে শুরু করেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পরিচালনার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলাকালীন আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং শুল্কমুক্ত নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়ে তার দেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসনে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই ইরান যুদ্ধ বিশ্ববাজারকেও নাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশ কমে যাওয়ার পর মঙ্গলবারও তেলের বাজারে এই দরপতন অব্যাহত ছিল।

ভ্যান্সের ইতিবাচক মূল্যায়ন

ইসরায়েল এই শান্তি চুক্তির সরাসরি কোনো পক্ষ ছিল না, তবে গত শুক্রবার তারা লেবাননে একটি নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। যদিও এরপর আরও একদিন তীব্র লড়াই চলেছিল, তবে লেবাননের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে শনিবার রাত থেকে লড়াইয়ের তীব্রতা অনেকটাই কমে এসেছে।

আজ মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ইরান যেভাবে লেবাননকে আমেরিকার সঙ্গে তাদের আলোচনার অংশ বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কিছুটা ম্লান বা ঢাকা পড়ে গেছে বলে মনে হলেও বৈরুত সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকেই বেশ ইতিবাচক অবস্থানে থাকা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, তেহরান দেশে পরমাণু পরিদর্শকদের ঢুকতে দিতে এবং বিদেশে অবরুদ্ধ থাকা তাদের সম্পদ ব্যবহারের পাশাপাশি যুদ্ধবিরতি তদারকির জন্য একটি মেকানিজম তৈরিতে রাজি হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আমরা খুব ভালো একটি ভিত্তি স্থাপন করেছি।’

তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনাকে বলেছেন, ইরান এখনো পরমাণু-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে আলোচনা করেনি এবং নতুন কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।

সোমবার ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে লিখেছেন যে, ইরান ‘পরমাণু সততা’ নিশ্চিত করতে অস্ত্র পরিদর্শনের অনুমতি দেবে।

পরবর্তীতে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান যদি তাদের চুক্তি মেনে না চলে বা তারা যদি ঠিকঠাক আচরণ না করে, তবে আমি যা করার তা-ই করব।’

গত বছর মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রথম দফা শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের সুযোগ সীমিত করে দেয় ইরান। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হলে তারা এই পরিদর্শন সম্পূর্ণ স্থগিত করে। তবে ইরান সবসময়ই দাবি করে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তেহরান তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত, বিদেশে আটকে থাকা কিছু সম্পদ ছাড় এবং ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালু করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে।

এদিকে ভ্যান্স জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউজের দূত ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করেছেন যার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার ইরানের অবরুদ্ধ তহবিল অবমুক্ত হওয়ার পর সেটির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে। আর এই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা, সয়াবিন ও গম কেনা যাবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘তার মানে, আমরা যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছি (এবং তহবিল ছাড়ছি), সেই টাকা আমাদের কৃষকদের কাছেই ফিরে আসবে।’

তবে ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেম্মাতি এমন কোনো বাধ্যবাধকতার কথা অস্বীকার করেছেন। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেছেন, অবরুদ্ধ তহবিলের অন্তত কিছু অংশ নিষেধাজ্ঞা বহির্ভূত অন্যান্য পণ্য কেনার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও এই সংক্রান্ত কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকার কথা রয়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement