ইরানের হুমকি সত্ত্বেও লেবাননে হামলা ইসরায়েলের, নিহত ৮

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মঙ্গলবার লেবাননের টাইর শহরে হামলা চালায় ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বন্দরনগরী টাইরে ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শহরটি খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই এই হামলা চালানো হয়, যা সাম্প্রতিক সংঘাতে টাইরে অন্যতম প্রাণঘাতী আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (৯ জুন) ইসরায়েল প্রথমবারের মতো টাইর শহরের পুরো এলাকার জন্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করে। এর কয়েক ঘণ্টা পরই শহরের পূর্ব প্রান্তে একটি বিমান হামলা চালানো হয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ওই হামলায় অন্তত আটজন নিহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের সন্ধান চালাচ্ছেন।

এক ভিডিওতে দেখা যায়, হামলার পর পুরো এলাকা জুড়ে রাস্তার ওপর ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন একটি গলিতে একটি ক্রেনকে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের পাশে কাজ করতে দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা মেডিসিন স্যান ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) বা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস জানায়, পরিস্থিতির কারণে তারা নিকটবর্তী কয়েকটি হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। ইসরায়েলের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ও পরবর্তী হামলা ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা মানুষকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

এমএসএফের মতে, এ ধরনের নির্দেশ মানুষকে অনিরাপদ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সরে যেতে বাধ্য করে, যা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার সকালে তারা পুরো টাইর শহর খালি করার নির্দেশ জারি করে। এর মধ্যে শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে আগে অন্য এলাকার বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল।

এর আগে ইসরায়েল দাবি করে, ওই এলাকায় ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা লুকিয়ে আছে। এ দাবির কোনো প্রমাণ অবশ্য দিতে পারেনি ইসরায়েল।

সেনাবাহিনী স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে আহ্বান জানায়, তারা যেন হিজবুল্লাহকে এলাকা ছাড়তে চাপ দেয় এবং সতর্ক করে দেয়— যদি তারা না সরে, তাহলে পুরো অঞ্চল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হামলার পর টাইর শহর থেকে ব্যাপকভাবে মানুষ পালাতে শুরু করেছে। যারা যেতে পারেননি, তাদের মধ্যে বয়স্কদের উদ্ধার করে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।

মানবিক সহায়তা কর্মীরা বলছেন, ধারাবাহিক হামলা ও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে এই সংঘাত শুরু হয় যখন হিজবুল্লাহ গাজায় মিত্র ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করে। এর জবাবে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে, যার ফলে দক্ষিণ লেবাননের বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

যুক্তরাষ্ট্র ১৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। বরং নিয়মিত হামলা ও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের কারণে বহু এলাকা কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে লেবাননের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। একদিকে ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলা, অন্যদিকে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি— সব মিলিয়ে মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, টাইরের মতো ঐতিহাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এমন হামলা শুধু সামরিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে। টাইর শহরে সর্বশেষ হামলা স্পষ্ট করছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে উত্তেজনা কমেনি। বরং নতুন করে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঢেউ পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বড় সুবিধা পাবে আইআরজিসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিতে যাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটিতে পরিণত হতে পারে।

৬ ঘণ্টা আগে

‘বিশ্বাসঘাতক’ ট্রাম্পের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় ক্ষোভ, এককভাবে লড়াইয়ের পক্ষে ইসরায়েলিরা

৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন এই নেতা এখন ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

৭ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা: সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন উইটকফ ও আরাগচি

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন ইরান যুদ্ধ চুক্তিকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা আবারও জোরদার হয়েছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উভয়েই সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে এক্সিওসের বরাতে জানিয়ে

৯ ঘণ্টা আগে

ইরান ইস্যুই গড়তে পারে জে ডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী এ ধরনের হাই-প্রোফাইল আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। কিন্তু ট্রাম্প দৃশ্যত রুবিওর পরিবর্তে ভ্যান্সকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে