রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের নজিরবিহীন ড্রোন হামলা, সেন্ট পিটার্সবার্গে জরুরি সতর্কতা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যাতে অজ্ঞাত স্থানে ড্রোন উড্ডয়ন ও বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা যায়। ছবি: বিবিসি

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহর ও এর আশপাশের এলাকায় এবার এক নজিরবিহীন ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামের সমাপনী দিনে এই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। আঞ্চলিক গভর্নর আলেকজান্ডার দ্রোজদেন্দো জানিয়েছেন, সেন্ট পিটার্সবার্গের চারপাশের লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে আকাশেই ১৪০টিরও বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর আলেকজান্ডার বেগলোভ শহরের বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। চার বছরেরও বেশি সময় আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম সেন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দাদের জন্য এমন সতর্কতা জারি করা হলো।

শনিবার (৬ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, তার বাহিনী রাশিয়ার অস্ত্রাগার এবং একটি নৌ ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। রুশ আগ্রাসনের জবাবে এটি ইউক্রেনের একটি ‘ন্যায়সংগত প্রতিরোধ’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এর মাত্র একদিন আগেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অর্থনৈতিক ফোরামে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে জেলেনস্কির সরাসরি আলোচনার প্রস্তাবের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং তার সঙ্গে বসার কোনো প্রশ্নই আসে না। পুতিনের সেই মন্তব্যের পরপরই এই বড় ধরনের ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটল।

এই ড্রোন হামলায় অংশ নেওয়া ইউক্রেনের ‘আনম্যানড সিস্টেমস ফোর্সেসে’র ৪১৩তম রেজিমেন্টের কমান্ডার ইয়েভহেন কারাস দাবি করেন, রাশিয়ার ভেতরে ঢুকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা এখন অত্যন্ত সহজ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা রাশিয়ার আকাশে এমনভাবে উড়ি যেন এটি আমাদের নিজেদেরই এলাকা। সেখানে প্রায় কোনো প্রতিরোধেরই মুখোমুখি হতে হয় না, ফলে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানো মোটেও কঠিন কিছু নয়।’

গভর্নর দ্রোজদেন্দো জানিয়েছেন, ইউক্রেনের এই হামলায় একটি সামরিক স্থাপনায় (নাম সুনির্দিষ্ট করা হয়নি) আগুন ধরে যায় এবং সেখান থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ভবনের ‘সামান্য’ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো প্রায় এক হাজার কিলোমিটার (৬২০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ অঞ্চলে পৌঁছায় এবং ক্রনশতাঁতে অবস্থিত ‘শত্রু নৌবাহিনীর অস্ত্রাগার ও ঘাঁটিতে’ সফলভাবে আঘাত হানে। উল্লেখ্য, ক্রনশতাঁতেই রাশিয়ান নৌবাহিনীর বাল্টিক ফ্লিটের প্রধান ঘাঁটি অবস্থিত।

জেলেনস্কি আরও জানান, ইউক্রেনের ‘দীর্ঘ-পাল্লার নিষেধাজ্ঞা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার অঞ্চলে অবস্থিত, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার (৩১০ মাইল) দূরের একটি তেল ডিপোতেও হামলা চালানো হয়েছে। ‘দীর্ঘ-পাল্লার নিষেধাজ্ঞা’ বলতে তিনি রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলাগুলোকে বোঝান।

কয়েক দিন আগে পুতিনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অর্থনৈতিক ফোরাম শুরুর দিকেও সেন্ট পিটার্সবার্গের উপকণ্ঠে ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হেনেছিল। রাশিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই বিশাল ফোরামে এবার ১৩০টি দেশের হাজার হাজার অতিথি অংশ নেন। এর মধ্যে বছরের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দলও বেশ নীরবেই এতে যোগ দেয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার পুতিনের কাছে লেখা এক খোলা চিঠিতে জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতি এবং ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে রুশ প্রেসিডেন্টের সাথে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, এই সংঘাতের দিকে মার্কিন প্রশাসন আবারও কখন মনোযোগ দেবে, তার জন্য ‘শুধু অপেক্ষা করে থাকা ভুল হবে’। প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও সম্প্রতি ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার বদলে গেছে।

তবে শুক্রবার অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া বক্তৃতায় পুতিন জেলেনস্কির সেই আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি তার আগের অবস্থানে অনড় থেকে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, যুদ্ধবিরতি দেওয়া হলে ইউক্রেন কেবল নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। রাশিয়ার লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি।

রাশিয়ার দীর্ঘদিনের দাবি হলো— ইউক্রেনকে অবশ্যই দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চল থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে, যা বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে যোগদানের চাওয়াও বাদ দিতে হবে। অপরদিকে ইউক্রেন তাদের কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। কিয়েভের যুক্তি, মস্কোকে কোনো ছাড় দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে তাদের আবারও আগ্রাসন চালাতে উৎসাহিত করবে।

এদিকে, পূর্ব ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত লুহানস্ক অঞ্চলে মস্কো নিযুক্ত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে তারা দুটি মহাসড়কে বাস চলাচল স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। রুশ রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ইউক্রেন এই ড্রোন অভিযান চালাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তার স্বার্থে বাসিন্দাদের ওই সড়কগুলো ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে।

পাশাপাশি, লুহানস্কে সাধারণ যাত্রী ট্রেন চলাচল এবং শিশুদের দলগতভাবে কোথাও যাতায়াতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাশিয়া-সমর্থিত প্রশাসন। যদিও পুতিন দাবি করেছেন যে, ‘লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক’ পুরোপুরি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনী অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে রুশ রসদ ও সরবরাহ লাইন লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। একজন সামরিক বিশ্লেষক বিবিসিকে জানিয়েছেন, মে মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার ২০০টিরও বেশি লরি এবং ৩০টিরও বেশি জ্বালানি ট্যাংকার ইউক্রেনীয় হামলায় ধ্বংস হয়েছে।

রাশিয়ার আক্রমণের পর গত চার বছরে ইউক্রেন নিজস্ব প্রতিরক্ষা খাতকে ব্যাপকভাবে উন্নত করেছে। কিয়েভ এখন নিয়মিতভাবে রাশিয়ার অভ্যন্তরে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম। বিশেষ করে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো এবং তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে ইউক্রেন, কারণ কিয়েভের মতে এই জ্বালানিই মস্কোর যুদ্ধযন্ত্রকে সচল রাখছে। তবে রাশিয়া বরাবরের মতোই কিয়েভের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এনেছে।

রাজনীতি/আইআর

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বড় সুবিধা পাবে আইআরজিসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিতে যাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটিতে পরিণত হতে পারে।

৬ ঘণ্টা আগে

‘বিশ্বাসঘাতক’ ট্রাম্পের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় ক্ষোভ, এককভাবে লড়াইয়ের পক্ষে ইসরায়েলিরা

৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন এই নেতা এখন ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

৬ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা: সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন উইটকফ ও আরাগচি

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন ইরান যুদ্ধ চুক্তিকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা আবারও জোরদার হয়েছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উভয়েই সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে এক্সিওসের বরাতে জানিয়ে

৮ ঘণ্টা আগে

ইরান ইস্যুই গড়তে পারে জে ডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী এ ধরনের হাই-প্রোফাইল আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। কিন্তু ট্রাম্প দৃশ্যত রুবিওর পরিবর্তে ভ্যান্সকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে