২৫০ বছরের পুরনো বিতর্ক সামনে— ট্রাম্প কি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা বদলে দিচ্ছেন?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন প্রকাশ্যেই নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন। তিনি তার মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এমনভাবে নিয়োগ দিয়েছেন, যেন তারা প্রকাশ্যে তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে রাখেন। যেসব বিশ্বনেতা তার অপছন্দের তালিকায় চলে যান, তাদের প্রকাশ্যে আক্রমণ করেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় করপোরেশনগুলোকেও নিজের ইচ্ছামতো চলতে চাপ প্রয়োগ করেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় অর্ধেক পথ পেরিয়ে আসার সময়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তার ক্ষমতার ‘কোনো সীমা নেই’।
এ মন্তব্যকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত বলে মনে করছেন। প্রায় আড়াই শ বছর আগে ব্রিটিশ রাজতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের ভিত্তিই ছিল একজন শাসকের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে না দেওয়ার দর্শন।
সমালোচকদের প্রশ্ন— আমেরিকার স্বাধীনতা এনে দেওয়া সেই বিপ্লবীরা আজকের ট্রাম্পকে দেখলে কী ভাবতেন? তাদের মতে, উত্তর খুব ইতিবাচক হতো না।
ট্রাম্পবিরোধীরা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘নো কিংস’, ‘ডেমোক্রেসি নট মোনার্কি’, ‘উই হ্যাভ আ কনস্টিটিউশন, নট আ কিং’সহ বিভিন্ন স্লোগানে বিক্ষোভ করেছেন। তাদের অভিযোগ, আগের যেকোনো প্রেসিডেন্টের তুলনায় ট্রাম্প ক্ষমতার সীমা আরও অনেক দূর পর্যন্ত ঠেলে দিচ্ছেন।
উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর আগে ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। একইভাবে ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার লক্ষ্যে পরিচালিত সামরিক অভিযানের বিষয়েও অধিকাংশ আইনপ্রণেতাকে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।

এ ছাড়া জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে কংগ্রেসে আইন পাস না করেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়।
সমালোচকদের আরেকটি অভিযোগ, সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কোমিসহ নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারিক ব্যবস্থা নিতে ট্রাম্প বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছেন। তাদের মতে, এতে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর থেকে হোয়াইট হাউজ ও ফেডারেল প্রসিকিউটরদের মধ্যে যে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব বজায় ছিল, তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সম্প্রতি ট্রাম্প বলেন, ‘আমি নিজেকে কোনো রাজা মনে করি না। কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করাতে আমাকে নরকসম পথ পাড়ি দিতে হয়।’
অবশ্য ট্রাম্প এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েই নির্বাচিত হয়েছিলেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি নীতি ও সরকারি কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনবেন। অভিবাসননীতি, বাণিজ্য, ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক— প্রায় সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলেন ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়া অনেক মার্কিন নাগরিক।
সাম্প্রতিক ইউগভের এক জরিপ অনুযায়ী, রিপাবলিকান ভোটারদের প্রতি পাঁচজনের চারজনই ট্রাম্পের কাজের প্রতি সন্তুষ্ট। তবে সব ভোটারকে বিবেচনায় নিলে তার জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক জুলিয়ান জেলাইজার বলেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা আগে অনেকেই করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার প্রতি ট্রাম্পের মতো এতটা আকৃষ্ট আর কোনো প্রেসিডেন্টকে মনে করতে পারছি না।
তবে রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক আমেরিকা ফার্স্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ পরিচালক জশুয়া ট্রেভিনো ভিন্নমত পোষণ করেন। তার মতে, ট্রাম্পের সুচিন্তিত রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পকে দেখলে অনেক সময় বাহ্যিক উপস্থাপনাকেই মূল বাস্তবতা মনে হয়।’
সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ও রিচার্ড নিক্সনের উদাহরণ টেনে জশুয়া ট্রেভিনো বলেন, তারাও নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী কিছু করছেন— এমন ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন।
প্রকৃতপক্ষে একজন প্রেসিডেন্টের হাতে কতটা ক্ষমতা থাকা উচিত— এ বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নয়, বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এটি চলে আসছে। অষ্টাদশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে একজন ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে যেতে পারে আশঙ্কা থেকে তাদের কেউ কেউ প্রেসিডেন্টের বদলে একটি নির্বাহী কমিটির মাধ্যমে দেশ পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
আবার অন্যদের মত ছিল ভিন্ন। ১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনকে লেখা এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনি একজনকে ভয় পান, আমি ভয় পাই অল্প কয়েকজনকে। জনগণের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত— এ বিষয়ে আমরা একমত। আপনি রাজতন্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর আমি অভিজাততন্ত্র নিয়ে। তাই আমি প্রেসিডেন্টকে আরও বেশি ক্ষমতা এবং সিনেটকে তুলনামূলক কম ক্ষমতা দিতাম।’

এমনকি একসময় প্রেসিডেন্টের জন্য রাজকীয় শোনায়— এমন উপাধিও বিবেচনা করা হয়েছিল। যেমন ‘হিজ হাইনেস’, ‘হিজ এক্সিলেন্সি’, ‘হিজ ইলেকটিভ ম্যাজেস্টি’, এমনকি ‘হিজ মাইটিনেসে’র মতো পদবিও আলোচনায় এসেছিল।
জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন ও বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিন সম্ভবত এসব সাংবিধানিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন মিডলটন ট্যাভার্নে। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও পুরোনো এই ঐতিহাসিক পানশালার দাবি, নতুন প্রজাতন্ত্রের শুরুর সময়ে তিনজনই সেখানে যেতেন।
সেখানেই বিবিসির কথা হয় ৬০তম জন্মদিন উদ্যাপন করতে আসা লরেইন রসের সঙ্গে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করতে চাইলেও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। আমি রাস্তায় নেমে ‘ইয়াহ, ইউএসএ, আমরা স্বাধীন’ বলে উদ্যাপন করব না।
লরেইন রসের উদ্বেগের বড় কারণ দরিদ্র পরিবার ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি কংগ্রেসের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তারা শুধু ট্রাম্পকে যা খুশি তাই করতে দিচ্ছে। অতীতে যেসব আইন প্রেসিডেন্টদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করত, সেগুলোও তিনি উপেক্ষা করছেন।’
তবে একই পানশালায় বিবিসির সঙ্গে কথা বলা অন্য অনেক মার্কিন নাগরিক রাজনীতির চেয়ে স্বাধীনতা দিবসের উৎসব নিয়েই বেশি আগ্রহী ছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন এ বছর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় পরিসরে উদ্যাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আটলান্টা থেকে এই পানশালায় আসা জন নক্স বলেন, তিনি ট্রাম্পকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে থাকতে চান না। তার মতে, কেউ যদি ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, তাহলে তার উপযুক্ত সময় হবে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান নয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য প্রান্তে কিস্টোন শহরে প্রেসিডেন্টের সফর ঘিরে চলছে প্রস্তুতি। আকাশে টহল দিচ্ছে সামরিক বিমান, নিরাপত্তায় মোতায়েন হয়েছে সিক্রেট সার্ভিস। ২৫০তম স্বাধীনতা উদ্যাপনের প্রাক্কালে ট্রাম্প সফর করবেন মাউন্ট রাশমোর। গ্রানাইট পাথরে খোদাই করা এই স্মৃতিস্তম্ভে জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিংকন ও থিওডোর রুজভেল্টের মুখাবয়ব রয়েছে।
ট্রাম্প নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অনেক মিম শেয়ার করেছেন, যেখানে তার মুখ ওই চার প্রেসিডেন্টের পাশে যুক্ত করা হয়েছে। তার অনেক সমর্থকও এ ধারণাকে সমর্থন করেন। এমনকি কংগ্রেসে ট্রাম্পের মুখ মাউন্ট রাশমোরে যুক্ত করার দাবিতে একটি বিলও উত্থাপিত হয়েছে।
মোটরসাইকেলে করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতীয় উদ্যান ঘুরে বেড়ানো বন্ধুদের একটি দলের সদস্য টেরি ডেভিস ও টিম বার্কও বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন। তারা ট্রাম্পের আতশবাজির অনুষ্ঠান দেখার টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি।
ট্রাম্পের মুখ মাউন্ট রাশমোরে যুক্ত করা উচিত কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ৭২ বছর বয়সী টেরি বলেন, ‘শুধু যুক্ত করাই নয়, তার মুখই সবচেয়ে বড় হওয়া উচিত। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমি আর কোনো প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এতটা আবেগী হইনি।’

তাদের মতে, ট্রাম্প এখনো একজন ‘বহিরাগত’ রাজনীতিবিদ। আর এ কারণেই তিনি ডেমোক্র্যাট ও অতিরিক্ত হস্তক্ষেপকারী ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করছেন— যা তারা ইতিবাচক বলেই মনে করেন। টিমের ভাষায়, ‘তিনি ক্ষমতা ছাড়ার ২০ বা ৩০ বছর পর ইতিহাসবিদরা বলবেন, তিনি আমাদের দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রেসিডেন্ট ছিলেন।’
তবে ইতিহাসবিদ জুলিয়ান জেলাইজারের মতে, একজন প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করেন, তার প্রভাব শুধু বর্তমান সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না, ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টদের জন্যও তা দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
জুলিয়ান বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সম্প্রসারণের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। এতে এমন নজির তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টরা ব্যবহার করতে পারেন। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে এসব বিষয় স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং মানুষ এগুলোকে প্রেসিডেন্টের স্বাভাবিক ক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে।’
১৭৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় জর্জ ওয়াশিংটন তার অভিষেক ভাষণে ক্ষমতা নিয়ে একেবারেই ভিন্ন মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একজন নেতার উচিত নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন থাকা।
ইতিহাসের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট’ বলে নিজেকে দাবি করা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে এমন বিনয়ী স্বীকারোক্তি কল্পনা করা কঠিন।
বিবিসি অবলম্বনে



















