প্রার্থী বাছাইয়ে নতুন মুখে ভর বিএনপির, ঠাঁই পাননি অনেক হেভিওয়েট

শাহরিয়ার শরীফ
স্থায়ী কমিটির ৪ সদস্য ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির হেভিওয়েট অনেক নেতাই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় স্থান পাননি। ছবি কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রথম দফায় ২৩৭ আসনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। এবার তালিকায় নতুন মুখের প্রাধান্য চোখে পড়েছে। পুরনোদের জায়গা থাকলেও বাদ পড়েছেন একাধিক হেভিওয়েট নেতা। নিজেদের পছন্দের নেতা মনোনয়ন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধসহ নানাভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।

সোমবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই তালিকা ঘোষণা করেন। এর আগে দলের স্থায়ী কমিটির সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠকে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।

ঘোষিত তালিকার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির পুরনো নেতাদের পাশাপাশি এবার এসেছে অনেক নতুন মুখ। ২৩৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮১ জন এবারই প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ১৫১ জন আগে কোনো না কোনো নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। বিএনপির নেতৃত্ব বলছে, এটি প্রবীণ ও নবীনদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ তালিকা।

তালিকায় রয়েছেন দলের প্রয়াত ও প্রবীণ নেতাদের সন্তান, স্ত্রী, তৃণমূল থেকে উঠে আসা কর্মী, সাবেক ছাত্রনেতা, চিকিৎসক, পেশাজীবী এবং প্রবাসী নেতারাও।

অন্যদিকে দলের প্রার্থী তালিকায় নেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও রফিকুল ইসলাম মিয়ার নাম। এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, সদ্য মনোনীত যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের মতো নেতার নামও বাদ পড়েছে।

দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মধ্যে আব্দুস সালাম, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আসলাম চৌধুরী, আমিনুর রশীদ ইয়াসিন এবং ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ও আসাদুজ্জামান রিপনের নামও তালিকায় রাখেনি বিএনপি।

প্রার্থী তালিকায় দেখা যায়নি সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার নামও। এমনকি একসময় ঢাকার আলোচিত প্রার্থী আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন অসীম ও রবিউল ইসলাম রবিও মনোনয়ন পাননি।

বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ‍্যে বাদ পড়েছেন ‘সিলভার সেলিম’ নামে পরিচিত শিল্পপতি এম এ এইচ সেলিম, যিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাগেরহাট সদর আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন তিনি। বাগেরহাট সদর, মোল্লারহাট এবং চিতলমারী নিয়ে পুনর্গঠিত বাগেরহাট ১ আসনে তিনি আলোচিত প্রার্থী, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত প্রার্থী রয়েছেন।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, বাগেরহাটে চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে এবং জনকল্যাণমূলক কাজ করে এম এ এইচ সেলিম এরই মধ‍্যে সাড়া ফেলেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবসায়িক হয়রানি, একের পর এক মামলা এবং অব্যাহত রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি রাজনীতি থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়ে সাময়িক টিকে থাকার কৌশল নিয়েছিলেন। জামায়াতের শক্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে হেভিওয়েট ও আর্থিকভাবে সচ্ছল প্রার্থী না দিলে এ আসনে বিজয়ের সম্ভাবনা কম বলে এলাকার বিএনপি নেতাদের অনেকেই মনে করছেন।

এদিকে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার নাম নেই তালিকায়, যদিও কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি।

বিএনপি সূত্র বলছে, প্রার্থী তালিকায় স্থান না পাওয়া হেভিওয়েটদের মধ্যে একাধিক নেতা নির্বাচন পরিচালনাসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। এ কারণে দল থেকে তাদের নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি।

দলীয় সূত্র জানায়, আগে থেকেই ‘এক পরিবারে একজন প্রার্থী’ নীতি কার্যকর ছিল। এ কারণে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদ, মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী ও সাবেক সাংসদ রুমানা মাহমুদকেও প্রার্থীর তালিকায় রাখা হয়নি। বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়, পুত্রবধূ নিপুন রায় চৌধুরীও মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু দলের এই নীতির কারণে তারা প্রার্থী হতে পারেননি।

দলীয় সূত্র জানায়, সারা দেশে তিন ধাপে জরিপ করে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক অবস্থান ও নির্বাচনি সক্ষমতা যাচাই করে বিএনপি। এরপর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমদ ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন প্রার্থীদের তালিকা পর্যালোচনা করেন।

প্রায় এক মাস ধরে ভার্চুয়াল ও সরাসরি বৈঠকের মাধ্যমে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেন বিএনপির এসব নেতা। জরিপের ফল ও মাঠের তথ্য যাচাই শেষে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ২৩৭ জনের নাম চূড়ান্ত হয়।

বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ৬৩টি আসন আপাতত ফাঁকা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ আসনে দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্যে আসতে পারেননি শীর্ষ নেতারা। বাকি ৪০টি আসন যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের জন্য বরাদ্দ থাকতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দীর্ঘ পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে আমরা এই তালিকা ঘোষণা করেছি। দলের স্বার্থে নির্বাচনে সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় প্রার্থীকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, ঘোষিত তালিকা প্রাথমিক। প্রয়োজনে সংশোধন আনা হতে পারে।

এদিকে মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই দেশের বিভিন্ন জেলায় মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের কর্মী-সমর্থকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনে দলীয় মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে মনোনয়নবঞ্চিত জাভেদ মাসুদ মিল্টনের সমর্থকরা সড়ক অবরোধ করেন। কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে মনোনয়ন না পাওয়ায় সাবেক এমপি সোহরাব উদ্দিনের অনুসারীরা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন।

চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সমর্থকরাও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এ ঘটনায় উপজেলার স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের চার শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

একইভাবে কুমিল্লা ও মাদারীপুরেও মনোনয়নবঞ্চিতদের পক্ষে বিক্ষোভ হয়েছে। মাগুরায় মনোনয়ন বঞ্চিতদের কর্মী সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে।

অবশ্য মনোনয়নবঞ্চিত অনেক বিএনপি নেতা তাৎক্ষণিকভাবে কর্মী সমর্থকদেরও দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কোনো ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ না করে ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

অন্যদিকে দলের প্রাথমিক তালিকায় থাকা প্রার্থীরাও কর্মী-সমর্থকদের কোনো ধরনের মিছিল-মিটিং, মিষ্টি বিরতণ থেকে বিরত থাকতে কড়া বার্তা দিয়েছেন।

বরিশাল-৫ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ। এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন মজিবুর রহমান সরোয়ার।

দলের সিদ্ধান্ত জানার পরপরই মনোনয়নবঞ্চিত রহমাতুল্লাহ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেন, আপনারা অনেকেই চেয়েছিলেন আমি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু দল বরিশাল-৫ আসনে, মজিবুর রহমান সরওয়ার ভাইকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। যেহেতু আমি দলের অনুগত একজন কর্মী, সেহেতু দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়ে ধানের শীষের বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত মাঠে-ময়দানে নিরলসভাবে কাজ করে যাব।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে রহমাতুল্লাহ আরও বলেন, আপনারা যারা দীর্ঘদিন ধরে আমার পাশে থেকেছেন, তাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ। আপনাদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা কেউ মন খারাপ করবেন না। ধানের শীষ বিজয়ী হলে আমরা সবাই বিজয়ী হব। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। অচিরেই আপনাদের সঙ্গে বরিশালের মাঠে দেখা হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

থেরাপি নিচ্ছি, সুস্থ হলেই দেশে ফিরব— মালয়েশিয়া থেকে মির্জা আব্বাস

শারীরিক অবস্থা এখন কেমন— জানতে চাইলে মির্জা আব্বাস বলেন, 'আছি মোটামুটি। এখনও চিকিৎসার মধ্যে আছি, থেরাপিউটিক সেশনগুলো চলছে। দেশবাসীকে আমার জন্য দোয়া করতে বলবেন। সবার কাছে আমি দোয়া চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।'

২ দিন আগে

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপ প্রয়োজন: পানিসম্পদ মন্ত্রী

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকরভাবে করারোপের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, প্রস্তাবিত তামাক কর বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব দেশের স্বাস্থ্য খাত শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

২ দিন আগে

এদেশের মানুষ কখনোই জামায়াতকে ক্ষমতায় আনবে না: মির্জা ফখরুল

ধর্মের নামে রাজনীতি করে জনগণের ভালোবাসা পাওয়া যায় না মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না । ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যারা মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়েছিল, এদেশের মানুষ সেই স্বাধীনতাব

২ দিন আগে

জামায়াত বিরোধী দল হওয়ার যোগ্য নয়: রাশেদ খাঁন

গণঅধিকার পরিষদ ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খাঁন বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর বিরোধী দল হওয়ার মতো রাজনৈতিক সক্ষমতা নেই। বরং যেকোনো সরকারের সঙ্গে থেকে সরকারঘেঁষা হওয়ার জন্য জামায়াত পারফেক্ট।

২ দিন আগে