সংবিধান সংশোধন কমিটিতে ‘যাবে না’ বিরোধী দল, স্থায়ী কমিটিতে সভাপতির পদ দাবি

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
সংসদ অধিবেশন কক্ষ। পিএমও ফাইল ছবি

আগের মতোই সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অনড় থেকে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এই কমিটিতে বিরোধী দলকে যোগ দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘জবরদস্তি’ করাকেও সঠিক বলে মনে করছে না দলটি। এ কমিটিতে অংশ না নিলেও জুলাই সনদ অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোতে সংসদের আসন অনুপাতে সভাপতির পদ দাবি করেছে তারা।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের ভাষ্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জুলাই সনদ অনুযায়ী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর বিরোধী দল এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তাদের ১০টি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিতে রাজি আছে সরকারি দল।

রোববার (৩০ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় কার্যদিবসে এ নিয়ে দুই দলের পক্ষ থেকে পালটাপালটি বক্তব্য এসেছে। পরে অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার বিষয়গুলো নিয়ে ‘ক্লোজ ডোর’ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করতে আহ্বান জানিয়েছেন।

এ দিন আগে গঠিত আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়; শিল্প মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত চারটি স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর বাইরে নতুন যেসব সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের কথা ছিল, সেগুলোর প্রস্তাব উত্থাপন করেননি চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম। বিরোধী দলের সঙ্গে আরও আলোচনা করে পরের বৈঠকে কমিটি গঠনের কথা জানান তিনি।

এর আগে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম দাবি করেছিলেন, বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তাকে টেলিফোনে সম্মতি দিয়েছেন যে বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে যোগ দেবে। সংসদে সে বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন বিরোধী দলীয় উপনেতা। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রিন্সিপাল ডিসিশন হচ্ছে, সংবিধান সংশোধন যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, এই কমিটিতে আমরা অংশগ্রহণ করব না।’

একটি কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্তে অন্য সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, সংসদীয় আসনের অনুপাতের তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে প্রায় ২৬ শতাংশ সদস্যপদ দেওয়া হচ্ছে। কেবল সদস্যপদ নয়, একই অনুপাতে বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ দেওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি।

সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী বিরোধী দল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে আসন অনুপাতে অংশ পাওয়ার অধিকার রাখে। এ বিষয়ে সরকারি দলকে আরও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

সরকারি দলের যুক্তি, আগে কখনো বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটিতে সভাপতি পদ দেওয়া হয়নি। এ বক্তব্যের বিরোধিতা করে মোহাম্মদ তাহের বলেন, অতীতে অনেক খারাপ নজির ছিল। সেসব অনুসরণ না করে বর্তমান সংসদে নতুন নজির তৈরি করা উচিত। আমরা মনে করি, একটা কমিটিতে জয়েন করানোর জন্য আমাদের ওপর শর্ত আরোপ করে জোর-জবরদস্তি করতে যে ট্র্যাডিশনের কথা বলছেন, এটা আমরা সঠিক মনে করি না।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিতে সরকারি দলের নীতিগত আপত্তি নেই। বরং আসনের অনুপাতে প্রায় ১০টি কমিটির সভাপতির পদ দিতে তারা প্রস্তুত। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য যে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, বিরোধী দলকে তাতে অংশ নিতে হবে।

চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে বিরোধী দলের জন্য পাঁচজন সদস্যের জায়গা রাখা হয়েছে। সেখানে তারা অংশ নিতে পারেন। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে সেই সনদের ভিত্তিতে সভাপতির পদ দাবি করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বিরোধী দল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ পেলে সরকারের কার্যক্রম তদারকির সুযোগ বাড়বে এবং সরকারের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও তার বক্তব্যে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংশোধন বিষয়ে কথা বলেন। স্পিকার নির্বাচনের আগে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সদিচ্ছা সংবিধান সংশোধনের আগেই দেখিয়েছে। ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার জন্য জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়নি। কিন্তু বিরোধী দল তখন সেই পদ নিতে রাজি হয়নি।

সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই কমিটির প্রথম বৈঠক এরই মধ্যে হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতি, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সম্পাদক, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি হবে। এরপর সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে আনা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাবও রয়েছে। কিন্তু সেজন্য তো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হতে হবে। সনদ বাস্তবায়ন হবে, সংবিধান সংশোধন করা হবে, তারপর পাবেন।

সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ নিজেই। এ কমিটিতে বিরোধী দলকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন। আপনাদের যা বক্তব্য আছে আমরা সেটা লিপিবদ্ধ করব। আপনাদের বক্তব্য জাতি জানবে। আপনারা সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন। অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না, এটা বিপরীতমুখী হয়ে যায়।

সরকারি ও বিরোধী দলের এমন পালটাপালটি বক্তব্যের মধ্যে একপর্যায়ে অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। তবে দেশের স্বার্থে সেই মতপার্থক্য কমানোর সুযোগ এখনো রয়েছে। ওপেন এভাবে ডিসকাস করতে না পারলেও ক্লোজ ডোরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বসেন।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্যও থাকতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে সেটি কমানোর সুযোগ রয়েছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিএনপি সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জনগণের অধিকার হরণ করছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অতীতে যারা গণতন্ত্র ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হয়েছে।

২০ ঘণ্টা আগে

৮ দফা প্রয়োজনে এক দফায় পরিণত হবে: জামায়াত আমির

শফিকুর রহমান বলেন, ১১ দলীয় লংমার্চ দেখে অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে, জাতির প্রয়োজনে ৮ দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এক দফা আসলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে।

২১ ঘণ্টা আগে

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে চীনের

নতুন করে আলোচনা শুরুর ফলে রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি মানবিক বোঝা হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সংকটে চীনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও ক্রমেই এক জায়গায় এসে মিলছে। আরও স্থিতিশীল রাখাইন রাজ্য চীনের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে লাভজনক হতে পারে।

১ দিন আগে

কোরআনের আলোকে সংবিধান রচনা হতে পারে, কোরআনকে সংবিধান মানা উচিত হবে না: আইনমন্ত্রী

বর্তমান জাতীয় সংসদে সংশোধিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন পাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আইনে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যারা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তৎকালীন আল বদর, তৎকালীন রাজাকার, তৎকালীন মুসলিম লীগ, তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী— এই তৎকালীন শব্দটা আগে

১ দিন আগে
Advertisement