মার্কিন নৌ অভিযান স্থগিতের পর ইরানের বার্তা— শুধু ন্যায্য চুক্তিই গ্রহণযোগ্য

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ১৭: ২২
গতকাল সোমবার নতুন করে হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপড়েন তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত নৌ অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের পর ইরান জানিয়েছে, তারা কেবল ‘ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য’ চুক্তিতেই রাজি হবে।

গতকাল মঙ্গলবার ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছিল এই মিশনটি। তবে এটি কার্যত ব্যর্থ হয় এবং চলমান যুদ্ধবিরতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করে।

বুধবার (৬ মে) রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানে সমুদ্রপথে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং এটি ইরানের পালটা হামলার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। হরমুজ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলাও চালিয়েছে ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কয়েকটি ছোট ইরানি নৌযানে হামলা চালিয়েছে।

চীন সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নৌ মিশন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘বড় ধরনের অগ্রগতি’ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘পারস্পরিক সম্মতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর থাকবে, তবে প্রজেক্ট ফ্রিডম সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে, যাতে বোঝা যায় চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব কি না।’

এর আগে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়ে গত রোববার ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নৌ অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইরানের ওই প্রস্তাবে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা স্থগিত রেখে প্রথমে যুদ্ধ ও জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনার কথা বলা হয়েছিল।

বুধবার (৬ মে) চীনের বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: রয়টার্স/আব্বাস আরাগচির টেলিগ্রাম চ্যানেল
বুধবার (৬ মে) চীনের বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: রয়টার্স/আব্বাস আরাগচির টেলিগ্রাম চ্যানেল

বুধবার চীন সফরকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তিনি বলেন, তেহরান ‘ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি’র অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে আরও জানান, তিনি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, যাতে উত্তেজনা আরও না বাড়ে।

ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যত বন্ধ হরমুজ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের বাদে সব ধরনের জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় । এপ্রিলে ওয়াশিংটনও আলাদাভাবে ইরানি বন্দরে অবরোধ আরোপ করে।

ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নৌ মিশনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার উদ্যোগও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এই উদ্যোগ ইরানের নতুন হামলাকে উসকে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।

মার্কিন অভিযান চলাকালে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হরমুজ ও এর আশপাশে কয়েকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কার্গো জাহাজের ইঞ্জিন রুমে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।

তেহরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও একাধিকবার হামলা চালায়, যার মধ্যে প্রণালির বাইরে অবস্থিত আমিরাতের একমাত্র প্রধান তেলবন্দরও রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনী জানায়, সোমবার তারা কয়েকটি ছোট ইরানি নৌযানে হামলা চালিয়েছে।

ট্রাম্পের নৌ মিশন স্থগিতের ঘোষণার পর ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ১.৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের নিচে নেমে আসে। তবে হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি— কতটা অগ্রগতি হয়েছে বা এই স্থগিতাদেশ কতদিন চলবে, তা নিয়েও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

রয়টার্স বলছে, যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প বারবার প্রমাণ ছাড়াই ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির দাবি করে সামরিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকতে দেওয়া যাবে না।

ট্রাম্পের দাবি: ইরান শান্তি চায়

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় যুদ্ধের সময় ইরানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সময়ে লেবাননে ব্যাপক প্রাণহানি এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইসরায়েল সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের ‘নির্মূল করতে’ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তবর্তী দক্ষিণ লেবাননে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স
মঙ্গলবার (৫ মে) ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তবর্তী দক্ষিণ লেবাননে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছে। মঙ্গলবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানের সামরিক শক্তি এখন ‘ছোটখাটো অস্ত্র’ দিয়ে গুলি চালানোর পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং তেহরান প্রকাশ্যে যুদ্ধোন্মাদনা দেখালেও বাস্তবে তারা শান্তি চায়।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ভোটারদের আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করছে।

রাজনীতি/আইআর

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ফের ইরানে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের

ওই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৮ মে) এ হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, হামলার পাশাপাশি ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের পূর্বাঞ্চলে অন্তত তিনটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।

১৪ ঘণ্টা আগে

ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় ৫ লাখ রুশ সেনা নিহত: ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ

জিসিএইচকিউ পরিচালক অ্যান কিস্ট-বাটলার তার প্রথম জনসমক্ষে দেওয়া বক্তৃতায় এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যের জন্য বর্তমান নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের রূপরেখা ব্যাখ্যা করেন।

১৬ ঘণ্টা আগে

মিনায় ‘শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ’, শেষ বড় আনুষ্ঠানিকতায় লাখো হাজি

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন মহান আল্লাহর নির্দেশে তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন শয়তান তাকে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিল। সেই সময় হজরত ইবরাহিম (আ.) তিন স্থানে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন। হাজিদের এই আনুষ্ঠানিকতা সেই

১ দিন আগে

সমঝোতার খসড়ায় উন্মুক্ত হরমুজের বিনিময়ে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার— দাবি ইরানের

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার খসড়া সামনে এসেছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। মার্কিন ওই খসড়া অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে তেহরান, যার বিনিময়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে প্রত্যাহার করা হবে নৌ অবরোধ ও

১ দিন আগে