ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসযজ্ঞের তথ্য গোপন যুক্তরাষ্ট্রের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ১৩: ১৪
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিনসংশ্লিষ্ট স্থাপনা। (ওপরে বাঁ থেকে) বাহরাইনে নৌ বাহিনীর তৎপরতা, ইসা বিমানঘাঁটি, রাফা বিমানঘাঁটি ও এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; (মাঝে বাঁ থেকে) হারির বিমান ঘাঁটি, আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি, আরিফজান ক্যাম্প ও বুয়েহরিং ক্যাম্প; (নিচে বাঁ থেকে) শুয়াইবা বন্দর, আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ও আল-দাফরা বিমানঘাঁটি। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির কোলাজ: ওয়াশিংটন পোস্ট

ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তা সরকারি হিসেবে স্বীকার করা ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের হামলায় অন্তত ২২৮টি স্থাপনা বা সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হ্যাঙ্গার, ব্যারাক, জ্বালানি ডিপো, বিমান, রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম। তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব ক্ষয়ক্ষতির তথ্যের বেশিরভাগই গোপন করেছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের পালটা হামলার প্রকৃত চিত্র এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন প্রকাশ করেনি। যুদ্ধ চলাকালে বিমান হামলার ঝুঁকি এতটাই বেড়ে যায় যে, কয়েকটি ঘাঁটিতে স্বাভাবিক জনবল রাখাও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ফলে যুদ্ধের শুরুতেই মার্কিন কমান্ডাররা বহু সেনাকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরে সরিয়ে নেন।

গুগল আর্থ থেকে নেওয়া মানচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা। ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট
গুগল আর্থ থেকে নেওয়া মানচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা। ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলায় এখন পর্যন্ত সাত মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন— এর মধ্যে ছয়জন কুয়েতে এবং একজন সৌদি আরবে। এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত চার শতাধিক সেনা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। আহতদের বেশিরভাগই কয়েক দিনের মধ্যে কাজে ফিরলেও অন্তত ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা।

ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের স্যাটেলাইট চিত্র সংগ্রহ করা অস্বাভাবিকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী দুটি বড় প্রতিষ্ঠান— প্লানেট ল্যাবস এবং ভ্যান্টর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুরোধে মধ্যপ্রাচ্যের ছবি প্রকাশ সীমিত, বিলম্বিত বা স্থগিত করেছে। ফলে ইরানের পালটা হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই বিধিনিষেধ কার্যকর হয়। তবে ভ্যান্টর দাবি করেছে, তারা সরকারের নির্দেশে নয়, নিজেদের সিদ্ধান্তে এই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।

অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করতে থাকে, যেখানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়।

স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ

এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকরা ইরানের রাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত ১২৮টি স্যাটেলাইট ছবি জিওলোকেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করেন। ছবিগুলোতে দাবি করা হয়েছিল, ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেগুলোর দৃশ্য সেখানে দেখানো হয়েছে। সাংবাদিকরা প্রথমে নিশ্চিত হন যে ছবিগুলো সত্যিই ক্যাপশনে উল্লেখ করা স্থানগুলোরই।

গত ৪ মার্চ ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কুয়েতের আরিফজান ক্যাম্প। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস থেকে ওয়াশিংটন পোস্ট
গত ৪ মার্চ ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কুয়েতের আরিফজান ক্যাম্প। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস থেকে ওয়াশিংটন পোস্ট

এরপর তারা ছবিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্যাটেলাইট ব্যবস্থা কপারনিকাসের অংশ ‘সেন্টিনেল-২’ স্যাটেলাইটের মধ্যম রেজল্যুশনের ছবি ব্যবহার করেন। বিভিন্ন স্পেকট্রাল ব্যান্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি যেখানে সম্ভব, সেখানে প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইটের উচ্চ রেজল্যুশনের অপটিক্যাল ছবির সঙ্গেও তুলনা করা হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুরোধে প্লানেট ল্যাবস ৮ মার্চের পর ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবি তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে গোপন রাখার নীতি চালু করে। ফলে ওই তারিখের পরের সময়ের উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি সাধারণভাবে আর পাওয়া যায়নি, যা তুলনামূলক বিশ্লেষণকে সীমিত করে দেয়।

ওয়াশিংটন পোস্ট ১০০টিরও বেশি উচ্চ রেজল্যুশনের ইরানি স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে ১০৯টি ছবির সত্যতা যাচাই করা হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্যাটেলাইট ব্যবস্থা কোপার্নিকাস এবং যেখানে সম্ভব, সেখানে প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে। ১৯টি ছবি পর্যাপ্তভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় সেগুলো বাদ দেওয়া হয়। তবে কোনো ইরান কর্তৃক প্রকাশিত কোনো ছবি জাল বা বিকৃত পাওয়া যায়নি।

পৃথকভাবে প্ল্যানেটের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে সাংবাদিকরা আরও ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া স্থাপনা খুঁজে পান, যেগুলোর ছবি ইরান প্রকাশ করেনি। সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট অন্তত ১৫টি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ২১৭টি ভবন এবং ১১টি সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার তথ্য পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্ষয়ক্ষতি প্রমাণ করে যে ইরানের লক্ষ্যভেদের সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অবমূল্যায়ন করেছিল। একই সঙ্গে শুরুর দিকে ইরানের আধুনিক ড্রোনযুদ্ধ সামলাতেও ব্যর্থ হয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘ইরানের হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তৈরি হওয়া এলোমেলো গর্তের কোনো চিহ্ন নেই।’

ওয়াশিংটন পোস্ট এর আগেও জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিল। তবে কিছু হামলা এমন সময় হয়েছে, যখন মার্কিন সেনারা আগেই ঘাঁটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ফলে সেসব স্থাপনা রক্ষা করা তখন আর অগ্রাধিকার ছিল না। ক্যানসিয়ানসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে চলমান বোমাবর্ষণ অভিযানকে ‘ব্যাপকভাবে ব্যাহত’ করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক কমান্ড সেন্টকম ওয়াশিংটন পোস্টের বিস্তারিত অনুসন্ধান নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে এক সামরিক মুখপাত্র ওয়াশিংটন পোস্টে বলেন, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলে সামরিক নেতারা আরও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ১৪টি মার্কিন ঘাঁটি বা আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনায় হামলার তথ্য দেয়। এপ্রিলের শেষ দিকে এনবিসি নিউজ জানায়, ইরানি যুদ্ধবিমান কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়েছে— যা বহু বছরের মধ্যে প্রথম ঘটনা, যখন কোনো শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান সরাসরি মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ১১টি ঘাঁটির ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। আর সিএনএন গত সপ্তাহে জানায়, ১৬টি মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত কুয়েতের বুয়েহরিং ঘাঁটি। ছবি: ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি অবলম্বনে ওয়াশিংটন পোস্ট
ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত কুয়েতের বুয়েহরিং ঘাঁটি। ছবি: ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি অবলম্বনে ওয়াশিংটন পোস্ট

কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকৃত হামলার সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি এর চেয়ে অনেক বেশি। পত্রিকাটি ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্ট ঘাঁটিগুলো মূলত মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত হলেও সেগুলো স্থানীয় দেশগুলোর বাহিনী ও মিত্রদের সঙ্গেও যৌথভাবে ব্যবহৃত হয়।

ছবিতে দেখা যায়, ওয়াশিংটন পোস্ট পর্যালোচনা করা অর্ধেকের বেশি ঘাঁটিতে বিমান হামলায় বহু ব্যারাক, হ্যাঙ্গার ও গুদামঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

ওপেন-সোর্স গবেষণা প্রকল্প ‘কনটেস্টেড গ্রাউন্ড’-এর গবেষক উইলিয়াম গুডহিন্ড বলেন, ‘ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ঘাঁটির আবাসন ভবন লক্ষ্যবস্তু করেছে, যাতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানো যায়। শুধু সামরিক সরঞ্জাম বা জ্বালানি ডিপো নয়, জিম, খাবারঘর এবং আবাসনও হামলার আওতায় এসেছে।’

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগকেন্দ্র, বাহরাইনের রিফা ও ইসা বিমানঘাঁটিতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরের একটি স্যাটেলাইট ডিশ, কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিংয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তিনটি ঘাঁটির পাঁচটি জ্বালানি সংরক্ষণ এলাকা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কুয়েতে আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের হামলায়। ওপরে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। নিচে প্ল্যানেট ল্যাব থেকে পাওয়া ছবিতেও তার প্রমাণ। ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট
কুয়েতে আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের হামলায়। ওপরে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। নিচে প্ল্যানেট ল্যাব থেকে পাওয়া ছবিতেও তার প্রমাণ। ছবি: ওয়াশিংটন পোস্ট

এ ছাড়া ইরানের প্রকাশিত ছবিতে কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ও আলি আল-সালেম ঘাঁটির রাডোম (রাডার অ্যান্টেনাকে আবহাওয়া ও প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি একটি বিশেষ গম্বুজ বা খোলস) ধ্বংসের ঘটনাও দেখা যায়। একই ধরনের ক্ষতি হয়েছে পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে। জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি স্থাপনায় টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটির আরেকটি স্যাটেলাইট যোগাযোগকেন্দ্র, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির একটি ই-৩ সেন্ট্রি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমান এবং একটি রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কারও ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ক্ষয়ক্ষতির অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর এবং কুয়েতের তিনটি ঘাঁটিতে— আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি, ক্যাম্প আরিফজান ও ক্যাম্প বুহরিংয়ে। ক্যাম্প আরিফজান হচ্ছে অঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান সদরদপ্তর।

পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণাত্মক অভিযান চালাতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, বাহরাইন ও কুয়েতের ঘাঁটিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ হতে পারে, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর অনুমতি পেয়েছিল। এর মধ্যে ৩১০ মাইলের বেশি পাল্লার হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হয়।

তবে ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, তাদের বিশ্লেষণ এখনো আংশিক চিত্রই তুলে ধরেছে। কারণ পর্যাপ্ত স্যাটেলাইট ছবি পাওয়া যায়নি।

ক্যানসিয়ান বলেন, কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়ত যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই মেনে নিয়েছে। মূল্যবান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বাঁচাতে অনেক সময় এমন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ঠেকানো হয় না, যেগুলো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ। আবার ইরানকে বিভ্রান্ত করতে ফাঁকা ঘাঁটিকে সচল দেখানোর কৌশলও নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

বদলে যাওয়া যুদ্ধক্ষেত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের হামলার মুখে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়ে ইরানি বাহিনী অনেক বেশি সক্ষম ও স্থিতিশীল ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড. কেলি গ্রিকো বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শক্তি দ্রুত ধ্বংস করে পালটা হামলা ঠেকানোর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আগে থেকে প্রস্তুত করা গোয়েন্দা সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছিল।

তিনি আরও বলেন, জুনে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ ব্যবহৃত হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও পরিকল্পনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ১৯০টি থাড ইন্টারসেপ্টর এবং ১ হাজার ৬০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। এটি যুদ্ধ শুরুর আগের মজুদের যথাক্রমে ৫৩ ও ৪৩ শতাংশ।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক জাস্টিন ব্রঙ্ক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলা ঠেকাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, তবে এর মূল্যও ছিল বিশাল— বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিপুল ব্যবহার।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়নি। মার্কিন বিশ্লেষণ সংস্থা সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের (সিএনএ) গবেষক ডকার ইভলেথ বলেন, ‘এই ড্রোনগুলোর বিস্ফোরক ক্ষমতা ছোট হলেও এগুলো আটকানো কঠিন এবং অনেক বেশি নিখুঁত। ফলে মার্কিন বাহিনীর জন্য এগুলো বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।’

তারা আরও বলেন, নিরাপদ বাংকার ও সুরক্ষিত আশ্রয়ের ঘাটতিও বড় সমস্যা। অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সেনা অবস্থান পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই ছিল। উদাহরণ হিসেবে কুয়েতের সেই ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে মার্চের শুরুতে ইরানি ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। ওই স্থাপনাটিতে ওপরে পর্যাপ্ত সুরক্ষা বা আড়াল ছিল না। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই ঘটনার তদন্ত করছেন।

আরেক ঘটনায় দেখা যায়, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির ই-৩ সেন্ট্রি বিমানটি একই খোলা ট্যাক্সিওয়েতে বারবার রাখা হচ্ছিল। কোনো সুরক্ষিত আশ্রয় না থাকায় সেটি শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়। তবে সেন্টকম এসব বিশ্লেষণ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। স্টিমসন সেন্টারের ফেলো ও অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনী কর্মকর্তা ম্যাক্সিমিলিয়ান ব্রেমার. বলেন, এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে— সেনাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হবে, নাকি আগের মতো ঘাঁটি সচল রেখে ভবিষ্যৎ হতাহতের ঝুঁকি মেনে নেওয়া হবে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাহরাইনের নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটির ক্ষয়ক্ষতি ‘ব্যাপক’। ফলে সেখানকার সদরদপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ট্যাম্পায় অবস্থিত ম্যাকডিল বিমানঘাঁটিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে সেন্টকমের সদরদপ্তর অবস্থিত। শিগগিরই সেনা, ঠিকাদার বা বেসামরিক কর্মীরা ওই ঘাঁটিতে ফিরবেন— এমন সম্ভাবনা কম।

আরও দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র আর কখনোই মধ্যপ্রাচ্যের এসব ঘাঁটিতে আগের মতো বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করবে না, যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ম্যাক্সিমিলিয়ান ব্রেমার বলেন, ‘আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে পুরো যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমেই স্বচ্ছ হয়ে উঠছে। মনে হতে পারে আমরা আক্রমণে আছি, কিন্তু বাস্তবে এসব ঘাঁটির চারপাশে আমরা এখন প্রতিরক্ষাতেই ব্যস্ত।’

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কেনিয়ায় তেলের দাম বৃদ্ধিতে রণক্ষেত্র, সংঘর্ষে নিহত ৪

ধর্মঘটের কারণে রাজধানী নাইরোবির প্রধান সড়কগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৫ ঘণ্টা আগে

ক্যালিফোর্নিয়ায় মসজিদে বন্দুক হামলা, হামলাকারীসহ নিহত ৫

স্যান ডিয়েগোর শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা স্কট ওয়াল রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ঠিক কী কারণে এই হামলা ঘটল— সে সম্পর্কে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মুসলিমদের প্রতি ঘৃণাপূর্ণ মনোভাবই এ হামলার কারণ।

৫ ঘণ্টা আগে

হামলা চালালে ‘রক্ত বন্যা’ বয়ে যাবে— যুক্তরাষ্ট্রকে কিউবার হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্র যদি কিউবার বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে ‘রক্তের বন্যা বয়ে যাবে’ বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল। তিনি বলেছেন, যার পরিণতি হবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ ও অপরিমেয়।

১৬ ঘণ্টা আগে

পশ্চিমবঙ্গে ইমাম-পুরোহিতদের ভাতা বন্ধ

সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক শেষে তথ্য ও সংস্কৃতি এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের অধীন ধর্মীয় ক্যাটাগরিতে চলমান প্রকল্পগুলো বন্ধের এই ঘোষণা দেওয়া হয়। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সাংবাদিকদের জানান, ধর্মীয় ক্যাটাগরির অধীনে থাকা এই প্রকল্পগুলো চলতি মে মাসের শেষ পর্যন্ত চালু থাকবে এবং আগ

১৭ ঘণ্টা আগে